images

ইসলাম

বাল্যবিবাহ ও দাম্পত্য সক্ষমতা: ফিকহ ও চিকিৎসাশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি

ধর্ম ডেস্ক

০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম

ইসলামি শরিয়ত ও মানব সভ্যতায় বিবাহ একটি পবিত্র সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন। এর মূল লক্ষ্য পারস্পরিক প্রশান্তি, নৈতিক সুরক্ষা এবং একটি সুস্থ প্রজন্মের মাধ্যমে স্থিতিশীল পরিবার গঠন। ইসলাম বিয়েকে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখে না, বরং এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানসিক সামঞ্জস্য এবং শারীরিক-মানসিক সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমসাময়িক বিশ্বে ‘বাল্যবিবাহ’ ও দাম্পত্য অধিকার নিয়ে ইসলামি ফিকহ (আইনশাস্ত্র) এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান- উভয়ই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।

কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বিবাহের যোগ্যতা

পবিত্র কোরআনে বিবাহের জন্য কেবল বয়স নয়, মানসিক পরিপক্বতাকেও শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা নিসার ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন, ‘তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করো, যতক্ষণ না তারা বিয়ের উপযুক্ত বয়সে পৌঁছায়; অতঃপর যদি তাদের মধ্যে পরিপক্বতা (রুশদ) দেখতে পাও, তাহলে তাদের সম্পদ তাদের হাতে তুলে দাও।’ এখানে ‘বিয়ের বয়স’ এবং ‘পরিপক্বতা’ উভয় বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ (স.) যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে।’ (সহিহ বুখারি)। এখানে ‘সামর্থ্য’ শব্দটি কেবল শারীরিক সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আর্থিক দায়িত্ব ও পারিবারিক জীবন পরিচালনার মানসিক যোগ্যতার এক সমন্বিত ধারণা।

আরও পড়ুন: কত বছর বয়সে বিয়ে করতে বলেছেন নবীজি

‘আকদ’ ও ‘দুখুল’ এর আইনি পার্থক্য

ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রে ‘আকদ’ (বিবাহচুক্তি) এবং ‘দুখুল’ (দাম্পত্য জীবন বা সহবাস শুরু)-এর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ফিকহবিদদের মতে, বিবাহের চুক্তি হওয়া মানেই দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনের নিঃশর্ত অনুমতি নয়। বরং স্ত্রী শারীরিকভাবে প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন শরিয়তসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে ‘শারীরিক সক্ষমতা’ বা ‘তাহাম্মুল আল-ওয়াতি’ একটি আবশ্যিক শর্ত। ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা রয়েছে- ‘খিয়ারুল বুলুগ’ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে বাতিলের অধিকার। যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় কারো বিয়ে হয়েও থাকে, তাহলে সাবালক হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই বিয়ে বহাল রাখা বা বাতিল করার অধিকার রাখে, যা ইসলামি আইনে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্মতির গুরুত্বকে প্রকাশ করে।

ফিকহি মূলনীতি ও শারীরিক সুরক্ষা

ইমাম সারাখসির আল-মাবসুত ও আল্লামা কাসানির বাদায়েউস সানায়ে-র মতো ধ্রুপদী গ্রন্থে শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। ইমামদের মতে, যদি শারীরিক অপরিপক্বতার কারণে স্ত্রীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে স্বামীর জন্য দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন বৈধ নয়। ইসলামের একটি মৌলিক আইনি নীতি হলো- ‘লা দারারা ওয়ালা দিরার’ (কারো ক্ষতি করা যাবে না)। এই নীতির আলোকে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি থাকলে তা প্রতিহত করাই শরিয়তের উচ্চতর লক্ষ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ)-এর দাবি।

আরও পড়ুন: মুসলিম বিয়েতে যেসব অনৈসলামিক চর্চা বর্জনীয়

সিরাতের নজির

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কন্যা ফাতেমা (রা.)-এর বিবাহ এ ক্ষেত্রে একটি আদর্শ উদাহরণ। সুনানে নাসায়ি’র বর্ণনা অনুযায়ী, বয়সের ব্যবধান ও পরিপক্বতার দিকটি বিবেচনা করে রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর কন্যার বিবাহের ক্ষেত্রে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সিরাত গবেষকদের মতে, বিয়ের সময় ফাতেমা (রা.)-এর বয়স ছিল আরবীয় প্রেক্ষাপটে পূর্ণ যৌবনকাল (১৫-২০ বছর)। একইভাবে আয়েশা (রা.)-এর বিবাহের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ওহির নির্দেশও একটি স্বতন্ত্র নজির হিসেবে বিবেচ্য। সামগ্রিকভাবে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ হলো- সন্তানের জন্য শারীরিক ও মানসিক কল্যাণ নিশ্চিত করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনকল্যাণ (মাসলাহা)

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বাল্যবিবাহের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকির বিষয়ে তথ্যনির্ভর সতর্কতা প্রদান করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও)-এর মতে, কৈশোরে প্রজনন অঙ্গসমূহ পূর্ণতা পাওয়ার আগেই গর্ভধারণ মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ইসলামি আইনের অন্যতম উৎস হলো ‘মাসলাহাত’ বা জনকল্যাণ। সমকালীন মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ ফিকহ একাডেমিগুলো একমত যে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বাল্যবিবাহের ক্ষতি প্রমাণিত হওয়ায় জনস্বার্থে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী নয়। রাষ্ট্র কর্তৃক বিবাহের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা ‘সিয়াসা শারইয়্যাহ’ (প্রশাসনিক নীতি)-এর আওতাভুক্ত।

বাল্যবিবাহ ইসলামি শরিয়তের কোনো লক্ষ্য নয়, বরং বিবাহের ক্ষেত্রে পরিপক্বতা, সক্ষমতা, সম্মতি এবং কল্যাণই ইসলামের মূল ভিত্তি। ইসলামি ফিকহ এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান উভয়ই স্পষ্টভাবে শারীরিক ও মানসিক পরিপক্বতাকে দাম্পত্য জীবনের প্রধান শর্ত হিসেবে গণ্য করে। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের জন্য ধর্মীয় বিধান ও মানবিক বাস্তবতার এই সমন্বয়ই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য।