images

ইসলাম

‘সুব্বুহুন কুদ্দুস’ দোয়াটি কি ফরজ নামাজেও পড়া যাবে?

ধর্ম ডেস্ক

২৫ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

ইসলামি শরিয়তে নামাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজের প্রতিটি রুকন বা স্তম্ভ আদায়ের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও তাসবিহ রয়েছে। এর মধ্যে সেজদা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, কারণ এই অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। নবী কারিম (স.) বলেছেন, ‘বান্দা সেজদারত অবস্থায়ই তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ লাভের সর্বোত্তম মুহূর্তে থাকে। অতএব তোমরা তখন অধিক দোয়া করো।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৮২)

তবে সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে প্রায়ই একটি জিজ্ঞাসা দেখা যায় যে, রুকু ও সেজদার নির্ধারিত দোয়ার সঙ্গে অন্যান্য জিকির যেমন ‘সুব্বুহুন কুদ্দুস’ কি কেবল নফল নামাজে সীমাবদ্ধ, নাকি ফরজ নামাজের সেজদাতেও এটি পাঠ করা যাবে? ফিকহি মূলনীতি ও নামাজের ধরন অনুযায়ী বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

জিকিরটির উৎস ও অর্থ

সহিহ হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জিকিরটির দালিলিক অবস্থান সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর রুকু ও সেজদায় এই দোয়াটি পাঠ করতেন- سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ উচ্চারণ: ‘সুবব্বুহুন কুদ্দুসুন রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ।’ অর্থ: ‘ফেরেশতাকুল এবং রুহ (জিবরাইল আ.)-এর প্রতিপালক অতি পবিত্র ও মহিমান্বিত।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৮৭; সুনানে আবু দাউদ: ৮৭২)

আরও পড়ুন: নফল নামাজের সেজদায় মনের চাওয়াগুলো বাংলায় বলা যাবে?

নামাজের ধরন অনুযায়ী ফিকহি বিধান

ফিকহি কিতাবসমূহের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নামাজের ধরনভেদে দোয়ার পরিধিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে-
১. ফরজ ও ওয়াজিব নামাজ: ফরজ বা ওয়াজিব নামাজের সেজদায় নির্ধারিত তাসবিহ (সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা) পাঠ করা সুন্নাহ। এর বাইরে হাদিসে বর্ণিত অন্যান্য মাসনুন দোয়া বা জিকির পাঠ করাও মূলত জায়েজ। তবে ফকিহদের মতে, ফরজ নামাজের গাম্ভীর্য ও পদ্ধতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় মূল তাসবিহর ওপর সীমাবদ্ধ থাকাই অধিকতর উত্তম বা ‘আফদাল’। (আদদুররুল মুখতার: ২/২৩৩)।
২. সুন্নতে মুয়াক্কাদা: জোহর বা ফজরের পূর্বের সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজগুলো রাসুল (স.) সাধারণত সংক্ষিপ্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এগুলোতেও নির্ধারিত তাসবিহ ও মাসনুন দোয়ার ওপর থাকাই ভালো। তবে অন্যকোনো মাসনুন দোয়া পড়লে নামাজে কোনো ত্রুটি হয় না।
৩. নফল ও সুন্নতে জায়েদা: নফল, তাহাজ্জুদ বা সুন্নতে জায়েদা (যেমন আছরের পূর্বের ৪ রাকাত) নামাজের সেজদায় ‘সুব্বুহুন কুদ্দুস’ সহ হাদিসে বর্ণিত অন্যান্য আরবি দোয়া করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/৩)

আরও পড়ুন: সেজদার আধ্যাত্মিক রহস্য: আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে যাওয়ার ৬ উপায়

সতর্কতা: ভাষা ও দোয়ার বিষয়বস্তু

নামাজে দোয়ার ক্ষেত্রে ফকিহগণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন-
ভাষার বিধান: হানাফি মাজহাবের বিধান অনুযায়ী, নামাজের ভেতরে কেবল আরবি ভাষায় দোয়া করা জায়েজ। অন্যান্য ভাষায় নামাজের ভেতর দোয়া করা থেকে বিরত থাকা উচিত। (হালাবি কাবির: ৩৩৫)
দুনিয়াবি প্রার্থনা: নবীজি (স.) বলেছেন, ‘নামাজ তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন তেলাওয়াতের স্থান; মানুষের কথাবার্তার মতো কথা বলা এখানে উচিত নয়।’ (মুসলিম: ৫৩৭) তাই হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নামাজের ভেতরে এমন দোয়া করা থেকে বিরত থাকা উচিত যা মানুষের সাধারণ কথাবার্তার সদৃশ (যেমন সরাসরি জাগতিক বস্তু বা টাকা-পয়সা চাওয়া)। বরং আখেরাত ও ক্ষমা সম্পর্কিত মাসনুন দোয়াগুলো পাঠ করাই নিরাপদ। (কিতাবুন নাওয়াজেল: ৪/১০৫)

পরিশেষে বলা যায়, ‘সুব্বুহুন কুদ্দুস’ দোয়াটি রাসুল (স.) থেকে প্রমাণিত একটি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন জিকির। ফরজ নামাজের সেজদায় এটি পাঠ করা জায়েজ হলেও মূল তাসবিহেই সীমাবদ্ধ থাকা নিরাপদ ও উত্তম। তবে নফল ও একাকী নামাজের ক্ষেত্রে এই দোয়ার মাধ্যমে সেজদাকে দীর্ঘায়িত করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় আমল। ইসলামি বিধিবিধান পালনে ‘জায়েজ’ এবং ‘উত্তম’ এই দুইয়ের সূক্ষ্ম পার্থক্য বজায় রাখাই সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য।

মুসলিম: ৪৮২, ৪৮৭, ৫৩৭; বুখারি: ৭৬১; আবু দাউদ: ৮৭২; আদদুররুল মুখতার: ২/২৩৩; হিন্দিয়া: ২/৩; ফতোয়ায়ে শামি: ১/৪৯৬; কিতাবুন নাওয়াজেল: ৪/১০৫; হালাবি কাবির: ৩৩৫