ধর্ম ডেস্ক
২১ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
আনন্দ ও উৎসবের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদের এই দিনটি ছিল পুরস্কারস্বরূপ। তবে উৎসবের আমেজ যখন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে, তখন মুমিনের মনে একটি প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক- রমজানে যে আধ্যাত্মিক শুভ্রতা আমরা অর্জন করেছি, তা কি ঈদের সাথেই বিদায় নেবে?
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, রমজান ছিল একটি প্রশিক্ষণ কোর্স এবং ঈদ হলো তার সমাবর্তন। সমাবর্তন শেষ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, শিক্ষা ভুলে যেতে হবে। বরং ঈদের আনন্দকে পাথেয় করে পরবর্তী ১১ মাস সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানোই প্রকৃত সার্থকতা। ঈদের সেই পবিত্র রেশ এবং রমজানের নূর ধরে রাখতে নিচের ৬টি আমল বা করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রমজানে আমরা যেভাবে মসজিদে গিয়েছি এবং জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেছি, সেই শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ঈদের পরবর্তী প্রধান কাজ। ইবাদতের ক্ষেত্রে সংখ্যা বা পরিমাণের চেয়ে ধারাবাহিকতা আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪৬৫)
বাস্তব প্রয়োগ: ঈদের আমেজ কাটিয়ে উঠে অলসতা পরিহার করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায়ের অভ্যাসটি আজ থেকেই পুনরায় ঝালিয়ে নেওয়া।
আরও পড়ুন: বান্দার যেসব আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়
রমজানের রোজা রাখার অভ্যাসকে ধরে রাখার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর সুন্নাহ হলো শাওয়াল মাসের ৬টি নফল রোজা। এটি রমজানের পবিত্রতাকে সারা বছরে ছড়িয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)
বাস্তব প্রয়োগ: পুরো মাসজুড়ে সুবিধাজনক সময়ে এই রোজাগুলো রাখা যায়। অনেকে ঈদের পরদিনই শুরু করেন, আবার অনেকে পুরো মাসে ভেঙে ভেঙে আদায় করেন।
ঈদের দিনে আমরা যেভাবে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করেছি, সেই যোগাযোগ সারা বছর বজায় রাখা জরুরি। ইসলামে আত্মীয়তার বন্ধন (সিলাহ-রাহিম) অটুট রাখাকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ভয় করো রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে।’ (সুরা নিসা: ১)
বাস্তব প্রয়োগ: মাসে অন্তত একবার আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া বা নিয়মিত ফোন করে কুশলাদি বিনিময় করা। এটি রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
আরও পড়ুন: আত্মীয়তা রক্ষা করলে আল্লাহ সুসম্পর্ক রাখেন
ঈদের কেনাকাটা ও খাবারে আমরা অনেক সময় আড়ম্বর করি, কিন্তু উৎসব শেষে সাধারণ জীবনে ফিরে আসা এবং অপচয় পরিহার করা ঈমানের দাবি। রমজান আমাদের মিতব্যয়িতার শিক্ষা দিয়েছে। কোরআন মাজিদে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৭)
বাস্তব প্রয়োগ: দৈনন্দিন খাদ্য ও খরচের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া এবং অতিরিক্ত বিলাসিতা পরিহার করে সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া।
রমজান আমাদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে ধৈর্য শিখিয়েছে। ঈদের পরও সেই ধৈর্য ও মানুষের সাথে সুন্দর আচরণের অভ্যাসটি বজায় রাখা ঈমানি দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। (সহিহ বুখারি)
বাস্তব প্রয়োগ: পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা রাস্তায় অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার মুহূর্তে রমজানের সেই ধৈর্যের কথা স্মরণ করা এবং নম্রতা বজায় রাখা।
আরও পড়ুন: ইসলামে প্রশংসিত চরিত্রের অধিকারী যারা
ঈদে আমরা ফিতরা ও জাকাত দিয়েছি। কিন্তু অভাবী মানুষের প্রয়োজন সারা বছরের। রমজানের মতো সারা বছরই দান করার মানসিকতা আমাদের অভাবমুক্ত সমাজ গড়তে সাহায্য করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা নিজেদের ধন-সম্পদ রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে প্রতিদান।’ (সুরা বাকারা: ২৭৪)
বাস্তব প্রয়োগ: সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আর্তমানবতার সেবায় দান করার অভ্যাস করা।
ঈদ কেবল একদিনের উৎসব নয়, এটি একটি নতুন সূচনার নাম। উৎসবের আনন্দ বিদায় নিলেও তার শিক্ষা যদি আমাদের প্রাত্যহিক আচরণে ও আমলি জীবনে প্রতিফলিত হয়, তবেই আমাদের সিয়াম সাধনা সফল হবে। রমজানের সেই ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতিই হোক আমাদের আগামী দিনগুলোর চলার পথের পাথেয়।