ধর্ম ডেস্ক
০৮ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম
পবিত্র রমজানের শেষ দশকের ইতেকাফ মুমিন হৃদয়ে এক প্রশান্তির নাম। দুনিয়াবি কোলাহল ও ব্যস্ততা থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর ঘরে তাঁরই সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য আয়োজন। তবে বর্তমান সময়ে এই পবিত্র নির্জনতার মাঝে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হাতে থাকা স্মার্টফোনটি। মসজিদের এক কোণে বসে যখন একজন ইতেকাফকারী স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকেন, তখন প্রশ্ন ওঠে- তিনি কি আসলেই ইতেকাফে আছেন, নাকি প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো দুনিয়াকেই মসজিদের ভেতরে নিয়ে এসেছেন? ইতেকাফে স্মার্টফোনের অবাধ ব্যবহার আমল কবুলের পথে বাধা কি না, তা নিয়ে ফিকহ শাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক দর্শনের আলোকে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ।
ইতেকাফের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো স্থানে নিজেকে আটকে রাখা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমরা যখন মসজিদে ইতেকাফ অবস্থায় থাকো, তখন স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৭) মুফাসসিরদের মতে, ইতেকাফের সময় স্ত্রী সহবাস নিষিদ্ধ করার গূঢ় রহস্য হলো- মুমিন যেন এই কদিন পার্থিব সমস্ত আনন্দ ও মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। অথচ স্মার্টফোন আমাদের সেই ‘বিচ্ছিন্নতা’ বা Seclusion-কে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। শরীর মসজিদে থাকলেও স্মার্টফোনের মাধ্যমে মন পড়ে থাকছে সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড, ব্যবসা বা বিনোদনের জগতে। ফলে ইতেকাফের যে মূল উদ্দেশ্য অন্তরের স্থিরতা, তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইতেকাফের গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা
স্মার্টফোন ব্যবহার করলে ইতেকাফ ভাঙবে কি না, তা নিয়ে ফকিহদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। ফিকহ শাস্ত্রের প্রামাণ্য কিতাব ‘বাদায়েউস সানায়ে’ এবং ‘ফতোয়ায়ে শামি’-তে ইতেকাফ ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- বিনা প্রয়োজনে মসজিদের সীমানা ত্যাগ করা কিংবা সজ্ঞানে স্ত্রী সহবাস করা।
সুতরাং, শুধু ফোন ব্যবহারের কারণে ইতেকাফ ভাঙবে না। তবে অপ্রয়োজনীয় কাজে মগ্ন থাকা ইতেকাফের সওয়াব ও বরকত কমিয়ে দেয়। ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে উল্লেখ আছে, ইতেকাফ অবস্থায় সম্পূর্ণ অনর্থক কাজে সময় ব্যয় করা ‘মাকরুহে তানজিহি’ বা অপছন্দনীয়। ইবাদতের স্থানে বসে দুনিয়াবি গল্পগুজব বা অনর্থক চ্যাটিং আমলের রুহ বা প্রাণকে নষ্ট করে দেয়।
শরিয়ত মানুষের প্রয়োজনের প্রতি সবসময় নমনীয়। ইতেকাফ অবস্থায় স্মার্টফোনের ব্যবহারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়-
১. বৈধ ও জরুরি ব্যবহার: পরিবারে খাবার আছে কি না তার খোঁজ নেওয়া কিংবা অফিসের অত্যন্ত জরুরি কোনো মেইল চেক করা- যা না করলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। ফিকহি মূলনীতি অনুযায়ী, ‘জরুরি প্রয়োজন’ সাধারণ নিয়মের ঊর্ধ্বে। এক্ষেত্রে অল্প সময়ের জন্য ফোন ব্যবহার করা জায়েজ।
২. অনর্থক ও ক্ষতিকর ব্যবহার: ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুক স্ক্রলিং, ইউটিউবে ভিডিও দেখা, অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং বা গেম খেলা। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অনর্থক আচরণ ত্যাগ করা।’ (তিরমিজি: ২৩১৭) ইতেকাফের মতো অতি মূল্যবান সময়ে এই নিরর্থক কাজগুলো আমল কবুলের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরও পড়ুন: নারীদের ইতেকাফের নিয়ম কানুন
ইতেকাফের লক্ষ্য হলো ‘খুশু-খুজু’ বা ইবাদতে একাগ্রতা অর্জন। স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন একজন ইতেকাফকারীর ধ্যানে বারবার ব্যাঘাত ঘটায়। অনেক মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যেতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তেলাওয়াত বা জিকিরে মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ে। মসজিদের ভেতরে বসেও যখন বাইরের জগতের খবরাখবর বা বিতর্কিত বিষয় আমাদের তাড়না দেয়, তখন ইতেকাফের আধ্যাত্মিক স্বাদটি আর অবশিষ্ট থাকে না।
১. ডিজিটাল ডিটক্সের নিয়ত: ইতেকাফের ১০ দিনকে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ হিসেবে গ্রহণ করুন। ফোনটি পরিবারের কারো কাছে জমা দিয়ে দিন।
২. সময় নির্ধারণ: একান্ত প্রয়োজনে ফোন রাখতে হলে দিনে মাত্র একবার নির্দিষ্ট ৫-১০ মিনিটের জন্য সেটি অন করুন।
৩. মুসহাফ ব্যবহার করুন: ফোনে কোরআন অ্যাপ ব্যবহার না করে সরাসরি ছাপানো কোরআন শরিফ ব্যবহার করুন। এতে ফোনের দিকে তাকালেই অন্য অ্যাপে প্রবেশের প্রলোভন তৈরি হবে না।
৪. ব্যবসায়িক লেনদেনে সতর্কতা: মসজিদের ভেতরে ফোনে বড় কোনো ব্যবসায়িক দরদাম বা লেনদেন করা মাকরুহ। যতটুকু সম্ভব এসব এড়িয়ে চলাই বাঞ্ছনীয়।
৫. স্মরণ রাখুন গন্তব্য: আপনি আল্লাহর দরবারে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বসেছেন। মেহমান যখন দাতা বা মেজবানের সাথে কথা না বলে সারাক্ষণ নিজের ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন তা যেমন সৌজন্যতাবোধের পরিপন্থী, আল্লাহর সামনেও তা একই রকম বেয়াদবি।
ইতেকাফ আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ। স্মার্টফোনের সীমিত ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার হয়তো ইতেকাফ ভঙ্গ করবে না, তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার ইবাদতের একাগ্রতা ও আধ্যাত্মিক স্বাদকে কমিয়ে দিতে পারে। তাই এই কদিন স্ক্রিনের চেয়ে সেজদাতে মনোনিবেশ করাই হোক মুমিনের সংকল্প।
সুরা বাকারা: ১৮৭; বাদায়েউস সানায়ে: ২/১১৪; রদ্দুল মুখতার: ২/৪৪৯; জামেউত তিরমিজি: ২৩১৭; আলমগিরি: ১/২১১