images

ইসলাম

শবে কদর নিয়ে যে ‘ভুল’ আমরা প্রতিবছর করি

ধর্ম ডেস্ক

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

শবে কদরের আর মাত্র ১৫-১৬ দিন বাকি। মুমিন হৃদয়ে এখন থেকেই গুঞ্জরিত হচ্ছে সেই মহান নিশির প্রতীক্ষা। আমাদের সমাজে একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭শে রমজানের রাতকে ‘শবে কদর’ হিসেবে ধরে নিয়ে কেবল ওই এক রাতেই ইবাদতের মহোৎসবে মেতে ওঠা। কিন্তু শবে কদর কি কেবল ২৭শে রমজানের জন্যই নির্ধারিত? সহিহ হাদিসের মানদণ্ডে কেবল একটি রাতের অপেক্ষায় বসে থাকা কি আমাদের বড় কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে না?

শুধু ২৭শে রমজানকে শবে কদর ভাবা কেন ঝুঁকিপূর্ণ?

শবে কদর বা লাইলাতুল কদর এমন এক রাত যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘এ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হলো সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।’ (ইবনে মাজাহ: ১৬৪৪) প্রশ্ন হলো, এই মহামূল্যবান রাতটি পাওয়ার জন্য আমরা কি সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করছি?

সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (স.) বলেছেন- ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে এবং প্রত্যেক বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (সহিহ বুখারি: ২০২৭)
বিজোড় রাতগুলো হলো- ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯শে রমজান। অর্থাৎ শবে কদর এই পাঁচটি রাতের যেকোনো একটিতে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেবল ২৭শে রমজানের অপেক্ষায় থাকা মানে হলো বাকি চারটি রাতের অফুরন্ত সওয়াব ও শবে কদর পাওয়ার সম্ভাবনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া।

আরও পড়ুন: শবে কদরে যেভাবে ইবাদত করবেন

তারিখ নিয়ে যে রহস্য ও হেকমত

নবীজি (স.) শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখটি আমাদের জানাতে চেয়েছিলেন। উবাদাহ ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (স.) লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ জানাতে বের হলেন, কিন্তু তখন দুজন মুসলমান বিবাদে লিপ্ত থাকায় সেই জ্ঞানটি ‘উঠিয়ে নেওয়া’ হয়। রাসুল (স.) বললেন, ‘হয়তোবা এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। তোমরা তা অনুসন্ধান করো ২৭, ২৯ ও ২৫তম রাতে।’ (সহিহ বুখারি: ৪৯)
এই ‘উঠিয়ে নেওয়া’ বা গোপন রাখার পেছনে হেকমত হলো- যেন বান্দা কেবল একটি রাতে নয়, বরং শেষ দশকের প্রতিটি রাতে আল্লাহর দুয়ারে কড়া নাড়ে।

প্রকৃতি ও আবহাওয়া: কদর চেনার ‘চেকলিস্ট’

নবীজি (স.) তারিখ নির্দিষ্ট না করলেও এই মহিমান্বিত রাতটি চেনার কিছু প্রাকৃতিক আলামত বলে গেছেন। পাঠকরা এই লক্ষণগুলো মিলিয়ে দেখতে পারেন-
১. রাতটি হবে উজ্জ্বল ও শান্ত: উবাদাহ ইবনে সামেত (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, কদরের রাতটি হবে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল, যেন তাতে উজ্জ্বল চাঁদ রয়েছে। এটি হবে নাতিশীতোষ্ণ—না ঠান্ডা, না গরম। (মুসনাদে আহমদ: ২২৭৬৫)
২. চাঁদের বিশেষ আকৃতি: আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, সে রাতে চাঁদ উদিত হবে ‘থালার একটি টুকরার ন্যায়’। (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৯)
৩. বৃষ্টির সম্ভাবনা: নবীজি (স.) স্বপ্নে দেখেছিলেন যে কদরের রাতের সকালে তিনি কাদা-পানির মাঝে সেজদা করছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এই রাতে মৃদু বৃষ্টি হতে পারে। (সহিহ বুখারি: ২০২৭)
৪. ভিন্নধর্মী সূর্যোদয়: কদরের রাত শেষে সকালে যখন সূর্য উঠবে, সেটি হবে উজ্জ্বল কিন্তু তীব্র আলোকরশ্মিহীন বা নিষ্প্রভ। (সহিহ মুসলিম: ১৬৭০)

আরও পড়ুন: শবে কদরে ভাগ্য লিপিবদ্ধ হয় যেভাবে

শবে কদর: এক রাতের জন্য হাজার মাসের সওয়াব

সুরা কদরের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- ‘মহিমান্বিত রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।’ অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদত ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের সমান। বুদ্ধিমান মুমিন কি কেবল একটি তারিখের (২৭ রমজান) ওপর বাজি ধরে এত বড় প্রাপ্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে?

ইবনে উমার (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, কোনো কোনো সাহাবিকে শেষ সাত রাতেও কদর দেখানো হয়েছে। (বুখারি: ২০১৫; মুসলিম: ২৬৩২) এই বৈচিত্র্যময় বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে যে, শবে কদর কোনো ধরাবাঁধা তারিখে বন্দি নয়, এটি শেষ দশকের যেকোনো বিজোড় রাতে হতে পারে। 

শবে কদর পাওয়ার নিশ্চিত কৌশল হলো- রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতে নিয়মিত ইবাদত করা। আসুন, আমরা ২৭শে রমজানের প্রথাগত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে শেষ ১০ দিনের প্রতি রাতে, বিশেষত বিজোড় রাতগুলোতে আল্লাহর রহমত খুঁজি। কারণ, ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় এই রাত ইবাদতে কাটালে পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি: ৩৫) আল্লাহ আমাদের সবাইকে বঞ্চিতদের কাতার থেকে রক্ষা করে মহিমান্বিত এই রাতের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।