ধর্ম ডেস্ক
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
চীনের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ২০২৬ সালের রমজান মাস এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী আবহ নিয়ে এসেছে। দেশটিতে কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব ‘চান্দ্র নববর্ষ’ বা ‘বসন্ত উৎসব’-এর আনন্দের মাঝেই শুরু হয়েছে পবিত্র সিয়াম সাধনা। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যখন দেশটিতে নববর্ষের দ্বিতীয় দিন পালিত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান মাস।
চীনা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, শীতকালীন অয়নের (২১ ডিসেম্বর) পর দ্বিতীয় নতুন চাঁদ ওঠার মাধ্যমে চান্দ্র নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। সাধারণত ২১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো একটি তারিখে এই নববর্ষ পড়ে। ২০২৬ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আসায় দেশটিতে সপ্তাহব্যাপী উৎসব শুরু হয়। কাকতালীয়ভাবে হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজানের চাঁদ দেখা দেওয়ায় বড় দুটি উৎসবের মিলন ঘটেছে একই সপ্তাহে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নববর্ষের প্রধান উৎসবের দিনগুলো এবং রমজানের শুরুর সময়টি এভাবে মিলে যাওয়া একটি বিরল ক্যালেন্ডারগত সঙ্গতি।

দক্ষিণ চীনের শেনজেন শহরের একটি মসজিদের ইমাম হাজি ইসহাক ঝং জানান, চীনের মুসলমানদের কাছে রমজান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস। এবারের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ বড় দুটি উৎসবের আমেজ একই সঙ্গে অনুভূত হচ্ছে।
ইমাম ইসহাকের মতে, ‘চীনা নববর্ষে যেমন আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ, এক টেবিলে পারিবারিক ভোজ এবং নতুন বছরের শুরুতে সদাচরণ ও সহমর্মিতার চর্চা করা হয়; মুসলমানরাও রমজান মাসে ঠিক এই মূল্যবোধগুলোই ধারণ ও লালন করতে চান। উৎসব ও ইবাদতের এই মিলন চীনের বহুজাতিক সমাজে মানবিক সহমর্মিতার এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।’
আরও পড়ুন: দেশে দেশে ইফতারে বাহারি আয়োজন
চীনের বিশাল ভূখণ্ডে রমজান বিভিন্ন নামে পরিচিত। হাজি ইসহাক জানান, মান্দারিন ভাষায় রমজানকে এক সময় ‘ফেং জাই’ বলা হতো, যার অর্থ রোজা সম্পন্ন করার মাস। আবার উত্তর-পশ্চিম চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের তুর্কিভাষী মুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলো এই মাসকে ‘রো জি’ নামে ডাকেন। চীনা মুসলিমদের কাছে রমজান কেবল পানাহার বর্জন নয়, বরং আচরণ ও চিন্তার শুদ্ধি। ইমাম হাজি ইসহাকের মতে, এই মাসে তাঁরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ, বৃদ্ধ ও এতিমদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, যাকে অনেকেই ‘বিপন্নদের স্বস্তির মাস’ বলে থাকেন।

চীনের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির সংবিধানে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে এবং নাগরিকরা আইনের আওতায় থেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন। বিশেষ করে রমজান মাসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে। রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়, যাতে রোজাদারদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করা যায়।
আরও পড়ুন: মক্কা-মদিনায় প্রথম তারাবিতে ১০ লক্ষাধিক মুসল্লি
চীনে মোট ১০টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে ‘হুই’ মুসলমানরা সবচেয়ে বড় এবং তাঁরা পুরো দেশে ছড়িয়ে আছেন। অন্যদিকে ‘উইঘুর’রা প্রধানত উত্তর-পশ্চিমের জিনজিয়াং অঞ্চলে বসবাস করেন। এ ছাড়া কাজাখ, কিরগিজ, উজবেক ও তাজিকসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মুসলিমরা চীনের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই ক্যালেন্ডারগত সমাপতন চীনের বিভিন্ন জাতিসত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক বন্ধন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরও দৃঢ় করার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
সূত্র: দ্য নিউ আরব, গালফ নিউজ
এমএইচআর