ধর্ম ডেস্ক
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন একটি সাময়িক রাজনৈতিক আয়োজন। কয়েক বছর পরপর ভোট আসে, উত্তেজনা সৃষ্টি করে, তারপর একসময় চলেও যায়। কিন্তু রক্ত, বৈবাহিক সূত্র ও পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্ক মোটেও সাময়িক নয়; এটি আজীবনের এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রজন্মান্তরের বন্ধন। দুঃখজনক হলেও সত্য, পছন্দের প্রার্থী বা দলকে কেন্দ্র করে মতভেদের কারণে বর্তমানে আমাদের সমাজ ও পরিবারগুলোতে বিভক্তি বাড়ছে। কথা বলা বন্ধ করা, এমনকি আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করার মতো ঘটনাও অহরহ ঘটছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কেবল সামাজিক অবক্ষয় নয়, বরং পরকালীন মুক্তির পথে এক ভয়াবহ অন্তরায়।
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রহিম) রক্ষা করা ‘ওয়াজিব’ বা আবশ্যিক দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের ওপর কঠোর হুঁশিয়ারি ও লানত বা অভিশাপ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তবে কি তোমরা এ প্রত্যাশা করছ যে, যদি তোমরা ক্ষমতা পাও তবে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরাই তারা, যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তাদের বধির করেছেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহ অন্ধ করে দিয়েছেন।’ (সুরা মুহাম্মদ: ২২-২৩)
রাজনৈতিক মতভেদের মতো তুচ্ছ পার্থিব কারণে যারা নিজ ভাই-বোন বা নিকটাত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে, তারা প্রকারান্তরে আল্লাহর এই কঠোর সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
আরও পড়ুন: আত্মীয়তা রক্ষা করলে আল্লাহ সুসম্পর্ক রাখেন
রাজনৈতিক নেতা বা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে গিয়ে যারা আত্মীয়ের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয় এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের জন্য জান্নাতের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন- ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪)
আমাদের একটু গভীরভারে ভেবে দেখা দরকার- যে নেতা বা দলের জন্য আমরা নিজের স্বজনের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করছি, তারা কি কেয়ামতের দিন আমাদের জান্নাতের জিম্মাদার হতে পারবেন? কখনোই না। অথচ একটি সম্পর্ক ছিন্নের দায় আমাদের পরকালে একাই বহন করতে হবে।
রাজনীতিতে আজকের মিত্র কাল শত্রু হতে পারে, আবার চরম শত্রুও মিত্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক অপরিবর্তনীয়। সাময়িক রাজনৈতিক আবেগে চিরস্থায়ী বন্ধন নষ্ট করা কোনো সচেতন মানুষের কাজ হতে পারে না। নবীজি (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি তার রিজিকে প্রশস্ততা এবং আয়ু বৃদ্ধি কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ, আত্মীয়তা রক্ষা করা কেবল পরকালীন ইবাদত নয়, এটি দুনিয়াতেও বরকত ও কল্যাণের উৎস। ভোটের জয়-পরাজয় আমাদের রিজিক বা হায়াত নির্ধারণ করে না, কিন্তু আত্মীয়তার হেফাজত আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত বয়ে আনে।
আরও পড়ুন: আত্মীয় জালেম হলে কেমন ব্যবহার করা উচিত
একই পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হওয়া একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রক্রিয়া। ইসলামে যৌক্তিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যেও বিভিন্ন পদ্ধতিগত বিষয়ে মতভেদ ছিল, কিন্তু তা কখনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা সম্পর্কচ্ছেদে রূপ নেয়নি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমরা পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য তিন দিনের অধিক তার ভাইকে ত্যাগ করে থাকা বৈধ নয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৬৫)
নির্বাচনের উত্তেজনায় অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা সরাসরি আত্মীয়-স্বজনকে গালি, অপবাদ এমনকি ‘কাফির’ বা ‘মুনাফিক’ বলার মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হন। ইসলামে কোনো মুসলিমকে অকারণে অপমান করা ফাসিকি কাজ। রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য যেন আমাদের বিবেককে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি)
আরও পড়ুন: আত্মীয়ের বাড়িতে ঘুরতে গেলে যে সওয়াব
১. রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত না করা।
২. পরিবারের বড়দের ও আত্মীয়দের রাজনৈতিক মত ভিন্ন হলেও তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও সৌজন্য বজায় রাখা।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বজনদের কটাক্ষ বা হেয় করে পোস্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
৪. রাজনৈতিক কারণে কোনো তিক্ততা তৈরি হয়ে থাকলে নিজ থেকেই এগিয়ে গিয়ে সালাম ও মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া।
ভোট এবং রাজনীতি দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার অংশ মাত্র, কিন্তু আত্মীয়তা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ নেয়ামত। সামান্য একটি ব্যালট পেপার বা সাময়িক কোনো ইশতেহারের কারণে বহু বছরের পারিবারিক বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলা কোনো সচেতন মুমিনের কাজ হতে পারে না। ভোট আসবে এবং যাবে, কিন্তু বিপদে-আপদে রক্তের আত্মীয়রাই শেষ পর্যন্ত পরম বন্ধুর মতো পাশে থাকে। তাই রাজনৈতিক সচেতনতা বজায় রেখেও হৃদয়ের বন্ধন অটুট রাখা আমাদের ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব।