ধর্ম ডেস্ক
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
রমজানের প্রস্তুতি বলতে আধুনিক সময়ে আমরা সাধারণত বাজারঘাট, ইফতারের কেনাকাটা বা বৈষয়িক আয়োজনকেই বুঝে থাকি। কিন্তু ইসলামের সোনালি যুগের মানুষ তথা সালফে সালেহিনদের কাছে রমজানের প্রস্তুতির ধরন ছিল একেবারেই ভিন্ন। তাঁদের কাছে এই মাসটি ছিল মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। তাই কেবল জাগতিক আয়োজন নয়, বরং আত্মিক ও মানসিক প্রস্তুতিই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। প্রখ্যাত তাবেয়ি মুয়াল্লা বিন ফজল বলেন, সাহাবায়ে কেরাম বছরের ছয় মাস আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন যেন তিনি তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। আর রমজান শেষ হওয়ার পর পরবর্তী পাঁচ মাস দোয়া করতেন যেন আল্লাহ তাঁদের আমলগুলো কবুল করে নেন। অর্থাৎ, তাঁদের পুরো বছরের আবর্ত তৈরি হতো রমজানকে কেন্দ্র করে। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজেও রজব মাসের চাঁদ দেখে আবেগভরে দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ, আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দিন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ (বায়হাকি: ৩৫৩৪)
রমজানকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করার একটি নিদর্শন হলো দিনক্ষণ গণনা করা। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) শাবান মাসের দিন-তারিখের হিসাবের প্রতি এত অধিক লক্ষ রাখতেন, যা অন্য মাসের ক্ষেত্রে রাখতেন না। (আবু দাউদ: ২৩২৫) তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিয়ে বলতেন, ‘তোমরা রমজানের জন্যে শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ: ২/১০৩) এতে রমজানের প্রতি মুমিনের ব্যাকুলতা ও ইবাদতের প্রতি আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন: রমজানের প্রস্তুতি: শাবান মাসে যে ৫ আমল মিস করা অনুচিত
সালাফদের কাছে শাবান মাস ছিল রমজানের ইবাদতের ‘প্রশিক্ষণকাল’। তাঁরা রমজানের মূল আমল অর্থাৎ কোরআন তেলাওয়াতের প্রস্তুতি নিতেন শাবান থেকেই। তাবেয়ি আমর বিন কাইস (রহ.) শাবান শুরু হলে নিজের ব্যবসা বন্ধ করে দিতেন এবং পূর্ণ সময় কোরআনের জন্য বরাদ্দ করতেন। তাঁরা বলতেন, ‘শাবান হলো তেলাওয়াতকারীদের মাস’।
পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (স.) শাবান মাসে বেশি নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে এই মাসের তুলনায় অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি। (মুসলিম: ১১৫৬) দীর্ঘ নামাজ ও সেজদার অভ্যাস করার মাধ্যমে তাঁরা রমজানের দীর্ঘ তেলাওয়াতকে ক্লান্তির বদলে প্রশান্তিতে রূপান্তর করতেন।
গুনাহ মানুষের অন্তরকে শক্ত করে দেয় এবং ইবাদতের স্বাদ কমিয়ে দেয়। তাই সাহাবিরা রমজানের আগেই তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে নিতেন। এছাড়া রমজান শুরু হওয়ার আগেই তাঁরা রমজানের মাসয়ালা-মাসায়েল ও ফজিলত নিয়ে আলোচনা করতেন। রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের উৎসাহিত করতে রমজানের ফজিলত বর্ণনা করতেন এবং জান্নাতের ‘রাইয়ান’ নামক দরজার সুসংবাদ দিতেন (বুখারি: ১৭৯৭)। মাস শুরুর আগেই শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা এবং জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করার সুসংবাদ প্রচার করে তিনি সাহাবিদের কল্যাণ আহরণে উদ্বুদ্ধ করতেন।
আরও পড়ুন: সাহাবিরা রমজান কাটাতেন যেভাবে
রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হতেন। সাহাবিরাও এই সুন্নাহর অনুসরণে রমজানের আগে থেকেই নিজেদের হাতকে অবারিত করতেন। রমজানে মানুষ যাতে অপচয় না করে বরং সেই অর্থ গরিবদের মাঝে দান করে, সেই শিক্ষা সালাফদের মাঝে প্রবল ছিল। বিশেষ করে জাকাত ফরজ হলে রমজানের আগেই তার হিসাব সম্পন্ন করে নেওয়া ছিল তাঁদের প্রজ্ঞা।
আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত প্রাপ্তির চেয়ে বড় কোনো আনন্দের বিষয় মুমিনের কাছে হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘বলো, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক।’ (সুরা ইউনুস: ৫৮) রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানের আগমনে অতিশয় আনন্দিত হতেন এবং সাহাবিদের বলতেন, ‘তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে।’ (নাসায়ি: ২১০৬)
সালাফদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন-
১. মানসিক সংকল্প: এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে, আসন্ন রমজান হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রমজান।
২. কাজাকাম সম্পন্ন করা: গত বছরের কোনো রোজা কাজা থাকলে তা শাবান মাসেই আদায় করে নেওয়া। (বুখারি: ১৯৫০)
৩. কোরআনের সাথে সখ্য: এখন থেকেই তেলাওয়াতের অভ্যাস শুরু করা যাতে রমজানে তা সহজ হয়।
৪. পরিবারকে শামিল করা: পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রমজানের ফজিলত আলোচনা করা এবং অপচয় বর্জন করার শপথ নেওয়া।
সাহাবিদের একাগ্রতা এবং ইবাদতের ব্যাকুলতা যদি আমাদের মাঝে সামান্যতমও সঞ্চারিত হয়, তবেই আমাদের সিয়াম সাধনা সার্থক হবে। বাজারঘাটের প্রস্তুতির চেয়ে আত্মিক প্রস্তুতিই মুমিনকে রমজানের প্রকৃত বরকত লাভে সাহায্য করে। রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবিদের প্রদর্শিত এই পথই রমজানকে ফলপ্রসূ করার একমাত্র উপায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের নবীজি (স.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে রমজানের পূর্ণ বরকত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।