ধর্ম ডেস্ক
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
মানুষের ব্যক্তিত্বের আয়না হলো তার ভাষা। সুন্দর ও মার্জিত কথা যেমন মানুষের হৃদয় জয় করে, তেমনি অশালীন ভাষা ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটায়। বিশেষত বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল পরিসরে ভাষার যে চরম নৈতিক সংকট দেখা যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণে পবিত্র কোরআনের ভাষাশৈলী ও নববি আদর্শ অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি। একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো তার মার্জিত ভাষা। সুন্দর কথা বলা যে কেবল শিষ্টাচার নয় বরং একটি ইবাদত বা সদকা, ইসলাম সেই বৈপ্লবিক শিক্ষাই আমাদের দিয়েছে।
মানুষের কথাবার্তার মাধ্যমে শয়তান সমাজে ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ খোঁজে। তাই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মুখ থেকে কেবল ‘অতি উত্তম’ কথাটিই বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা বনি ইসরাঈলে আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘আমার বান্দাদের বলুন, তারা যেন মুখ হতে সেসব কথাই বের করে যা অতি উত্তম। আসলে শয়তানই মানুষের মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করে থাকে। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ (আয়াত: ৫৩)
অর্থাৎ, সাধারণ ভালো কথার চেয়েও শব্দচয়নে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা মুমিনের কাজ, যাতে শয়তান পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কোনো ফাটল ধরাতে না পারে। পবিত্র কোরআনের অন্য জায়গায় আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় কথা বলো।’ (সুরা বাকারা: ৮৩)
আরও পড়ুন: অপ্রীতিকর আচরণ যেভাবে মোকাবেলা করতেন নবীজি
মানুষের প্রতি কঠোরতা নয়, বরং কোমলতা প্রদর্শনের মাধ্যমেই দ্বীন ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কোমল স্বভাব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘এটা আল্লাহরই দয়া যে, আপনি তাদের প্রতি ছিলে কোমল প্রকৃতির। তা না হয়ে যদি আপনি তাদের প্রতি কঠোর ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৫৯)
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, কর্কশ ভাষা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সুন্দর ভাষা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। খোদাদ্রোহী ফেরাউনের কাছেও যখন মুসা ও হারুন (আ.)-কে পাঠানো হয়, তখন নির্দেশ ছিল- ‘তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে।’ (সুরা ত্বহা: ৪৪)
অজ্ঞতা ও জাহেলিয়াতের যুগে মানুষ কর্কশ ও অহংকারী ভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা সবসময় আল্লাহভীতির ওপর সুদৃঢ় থাকে। সুরা ফাতাহতে আল্লাহ বলেন- ‘যখন কাফেররা তাদের মনে জাহেলি সংকীর্ণতার স্থান দিল, তখন আল্লাহ তাঁর রাসুল ও ঈমানদারদের ওপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাদেরকে তাকওয়ার নীতির (কালিমায়ে তাকওয়া) ওপর সুদৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত রাখলেন।’ (আয়াত: ২৬)
আরও পড়ুন: 'তাকওয়া' ঈমানের প্রাণ ও মর্যাদার মাপকাঠি
এই ‘কালিমায়ে তাকওয়া’ হলো সেই ভারসাম্যপূর্ণ ও মার্জিত কথা, যা একজন মুমিনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। যুক্তিতর্কের ক্ষেত্রেও আল্লাহ উত্তম পন্থার নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা আনকাবুত: ৪৬)
সুন্দর কথা বলা কেবল মানবিকতা নয়, এটি একটি বড় ইবাদতও বটে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে কথা বলা একটি দান (সদকা)।’ (তিরমিজি: ১৯৫৬) অন্যদিকে, মুখের জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতকারীর জন্য তিনি জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি: ৬৪৭৪) হজরত লোকমান (আ.)-এর সেই বিখ্যাত নসিহত অনুযায়ী, কণ্ঠস্বর নিচু রাখা এবং কর্কশতা পরিহার করা ঈমানের দাবি (সুরা লোকমান: ১৯)
১. ভালো কথা বলা: যে কথা মানুষের নেকি অর্জনে এবং পরকালের পথ সুগমে সহায়ক হয়।
২. মিথ্যা ও গিবত বর্জন: যেকোনো তথ্য শোনামাত্রই সত্যতা যাচাই ছাড়া প্রচার করা মানুষকে মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। (আবু দাউদ: ৪৯৯২)
৩. উদ্দেশ্য সঠিক রাখা: লোভ, হিংসা বা দুনিয়াবি স্বার্থহীনভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনম্র ভাষায় নসিহত করা।
সুন্দর ও মার্জিত কথা কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং এটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। মিথ্যা, গিবত ও অশালীন কথা শয়তানের কাজ, যা থেকে দূরে থাকা ঈমানের দাবি। কোরআনের প্রতিটি কথা যেমন আমাদের জ্ঞানের ভিতকে মজবুত করে, তেমনি তা আমাদের উত্তম ভাষা শেখার আদর্শ উৎস। মার্জিত ভাষার এই চর্চাই পারে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করতে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মার্জিত ভাষায় কথা বলার তাওফিক দান করুন। আমিন।