ধর্ম ডেস্ক
২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:২১ পিএম
মানুষ হিসেবে আমাদের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় আমরা প্রায়ই ভুল করে ফেলি। অনেকে ভুল বুঝতে পেরে তা শুধরে নেন, আবার কেউ কেউ নিজের ভুলের ওপর গোঁ ধরে বসে থাকেন। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেকে ভুল স্বীকার করাকে ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী বা সম্মানহানি মনে করেন। অথচ ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও ইতিহাসের দালিলিক প্রমাণ বলছে- ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, বরং এটিই নৈতিক শক্তি ও ব্যক্তিত্বের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব।
ইসলামি জীবনদর্শনে মানুষকে ভুল ও তওবার সুযোগ দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) এই চিরন্তন সত্যটি হাদিসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা তওবা করে (ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে)।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫১; সুনানে তিরমিজি: ২৪৯৯)
পাপ করার পর অনুতপ্ত হওয়া আল্লাহর কাছে এতটাই প্রিয় যে, সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (স.) বলেছেন- ‘যদি তোমরা পাপ না করতে তবে আল্লাহ এমন মাখলুক বানাতেন যারা পাপ করত এবং আল্লাহ তাদের মাফ করে দিতেন।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৮৫৬)
আরও পড়ুন: জানুন আল্লাহর ক্ষমা লাভের সহজ ৪ শর্ত
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও নবীগণ তাঁদের ত্রুটির জন্য তাৎক্ষণিক অনুশোচনা ও অকৃত্রিম স্বীকারোক্তির দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
হজরত আদম (আ.): নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের পর তিনি কোনো অজুহাত না দেখিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন- ‘হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আর যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।’ (সুরা আরাফ: ২৩)
হজরত মুসা (আ.): নবুয়ত প্রাপ্তির আগে অনিচ্ছাকৃতভাবে এক ব্যক্তিকে আঘাত করার পর তিনি সরাসরি একে ‘শয়তানের কারসাজি’ বলে স্বীকার করেন এবং বলেন- ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি অবিচার করেছি। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন।’ আল্লাহ তাঁর এই অকপট স্বীকারোক্তির কারণে তাঁকে ক্ষমা করে দেন। (সুরা কাসাস: ১৫-১৬)
আরও পড়ুন: মুসা (আ.)-এর কবুল হওয়া ৪ দোয়া
সাহাবিদের জীবন থেকে আমরা দেখতে পাই যে, ভুল স্বীকারকারী ব্যক্তি ক্ষমার অধিকারীর চেয়েও আগে আল্লাহর কাছে কল্যাণ লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর একটি ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
একবার কোনো এক বিতর্কে আবু বকর (রা.)-এর কথায় ওমর (রা.) রাগান্বিত হন। আবু বকর (রা.) সাথে সাথে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ওমরের পিছু নিয়ে ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু ওমর (রা.) তখন ক্ষমা না করে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। বিষয়টি রাসুল (স.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি বলেন, ‘তোমাদের এই সঙ্গী আবু বকর আগে কল্যাণ লাভ করেছে।’ আবু বকর (রা.) রাসুল (স.)-এর সামনেও বারবার বলছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমিই বেশি দোষী ছিলাম।’ রাসুল (স.) এই ঘটনায় আবু বকর (রা.)-এর সততা ও আগে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতাকে অনন্য মর্যাদা দেন। (সহিহ বুখারি: ৪৬৪০)
ভুল স্বীকারের ক্ষেত্রে কেবল ‘দুঃখিত’ বলাই যথেষ্ট নয়, বরং এর কিছু নৈতিক শিষ্টাচার রয়েছে-
১. সরাসরি দায়ভার গ্রহণ: ভুল স্বীকারের সময় অন্য কারো ওপর দায় না চাপিয়ে সরাসরি নিজের অপরাধ স্বীকার করা। নিজের ভুল ঢাকতে গিয়ে কাউকে দোষারোপ না করা।
২. অনিচ্ছাকৃত ভুল স্পষ্ট করা: ভুলটি যদি নিজের অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে থাকে, তবুও তা সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট করা। এটি মানুষের সামনে ব্যক্তির বিশ্বস্ততা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
৩. সমাধানের পথ খোঁজা: ভুলের কারণে কোনো সংকট তৈরি হলে তর্কে না জড়িয়ে তা সমাধানের আন্তরিক চেষ্টা করা এবং একই ভুল বারবার করা থেকে সতর্ক থাকা।
আরও পড়ুন: কাউকে কষ্ট দেওয়ার পর ক্ষমা না পেলে করণীয় কী
যখন কেউ নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং ক্ষমা চায়, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ বলেন- ‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ সৎকর্ম পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)
ভুল স্বীকার করা কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সোপান। ‘আমি ভুল করেছি, আমাকে মাফ করে দিন’- এই সামান্য কথাটুকু দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও সামাজিক বিবাদ মিটিয়ে দিতে পারে। নবী ও সাহাবিগণের জীবন থেকে পাওয়া এই মহান শিক্ষার চর্চা করলে আমাদের সমাজ আরও মানবিক, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এমএ