ধর্ম ডেস্ক
২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
মানুষের রুচি, চিন্তা ও বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা মানুষকে রোবট বা একই ছাঁচে ঢালাই করে সৃষ্টি করেননি; বরং তাদের দিয়েছেন চিন্তার স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্য। ইসলামে পরমত সহিষ্ণুতা বা ‘তাসামুহ’ একটি মহৎ মানবিক গুণ। নিজের মতের ওপর অটল থেকেও অন্যের মতকে শ্রদ্ধা জানানো এবং উগ্রতা পরিহার করাই হলো পরমত সহিষ্ণুতা; যা সত্যের সন্ধানে অবিচল থাকার জন্যও জরুরি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে নম্রতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন।
১. জবরদস্তি নেই: আল্লাহ বলেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ মিথ্যা পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।’ (সুরা বাকারা: ২৫৬)
২. উত্তম বিতর্ক: ভিন্নমতের মানুষের সাথে আচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি মানুষকে দাওয়াত দিন আপনার রবের পথে হেকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে তর্ক করুন উত্তম পন্থায়।’ (সুরা নাহল: ১২৫)
রাসুলুল্লাহ (স.) ছিলেন গভীর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার মূর্তপ্রতীক। তিনি অন্যের মতামত বা কথাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং ভিন্নমত পোষণকারীকে সংশোধনের ক্ষেত্রেও অপূর্ব ধৈর্যের পরিচয় দিতেন।
আরও পড়ুন: নবীজির কথাবার্তার ১০ সৌন্দর্য
আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, এক তরুণ নবীজি (স.)-এর কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে জিনা (ব্যভিচার) করার অনুমতি দিন।’ এ কথা শুনে উপস্থিত সাহাবিরা তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘থাম! থাম!’ কিন্তু রাসুল (স.) তাকে ধমক দেননি। তিনি তাকে কাছে ডেকে বসালেন এবং শান্তভাবে প্রশ্ন করলেন- ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এটা পছন্দ করবে?’ যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম!’ নবীজি বললেন, ‘মানুষেরা এটা তাদের মায়েদের জন্য পছন্দ করবে না।’ এরপর তিনি মেয়ে, বোন, ফুফু এবং খালার উদাহরণ দিয়ে একই প্রশ্ন করলেন।
প্রতিবারই যুবক বলল, ‘না’। অবশেষে নবীজি (স.) তাকে বোঝালেন যে, কেউ নিজের পরিবারের জন্য যা পছন্দ করে না, তা অন্যের জন্যও করা উচিত নয়। এরপর তিনি তার বুকে হাত রেখে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি তার গুনাহ ক্ষমা করে দাও, তার হৃদয় পবিত্র করে দাও এবং তার লজ্জাস্থানকে হেফাজত করো।’ (মুসনাদ আহমদ: ২২২৬৫) এই ঘটনা প্রমাণ করে, নবীজি (স.) ভিন্নমত বা আপত্তিকর কথা শুনেও উত্তেজিত হতেন না, বরং যুক্তি দিয়ে তা শুধরে দিতেন।
বদর যুদ্ধে বিজয়ের পর যুদ্ধবন্দিদের বিষয়ে তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দেন তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করার জন্য। সাহাবিরা এই নির্দেশ এতটাই গুরুত্বের সাথে পালন করেছিলেন যে, তারা নিজেরা খেজুর খেতেন (যা মদিনায় সাধারণ খাদ্য ছিল) আর বন্দিদের খাওয়াতেন রুটি (যা তখন মূল্যবান খাদ্য ছিল)। (ইবনে হিশাম: ১/৬৪৫; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/৩০৭) শত্রুর প্রতি এমন সহিষ্ণুতা ইতিহাসে বিরল।
আরও পড়ুন: মহানবী (স.)-এর মহানুভবতার কিছু অনন্য উদাহরণ
সাহাবায়ে কেরামও অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতেন। নিজের মতই সঠিক—এমন একগুঁয়েমি তাঁদের মধ্যে ছিল না।
ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের সময় খ্রিস্টান নেতারা শর্ত দিল যে, খলিফাকে মদিনা ছেড়ে সশরীরে এসে চাবি গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে খলিফা ওমর (রা.) পরামর্শ চাইলেন। উসমান (রা.) পরামর্শ দিলেন- ‘এটা হীনকর শর্ত। আপনি যাবেন না, বরং অবরোধ কঠোর করুন।’ আলী (রা.) ভিন্নমত পোষণ করে বললেন: ‘অবরোধে কালক্ষেপণ ও প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি। তার চেয়ে আপনার সেখানে যাওয়াটাই উত্তম হবে এবং এতে মুসলিমদের বিজয় ত্বরান্বিত হবে।’ খলিফা ওমর (রা.) নিজের বা উসমান (রা.)-এর মতের ওপর জেদ না করে আলী (রা.)-এর পরামর্শকে অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করলেন এবং জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। (মুসতাদরাক হাকেম: ২০৮; আল-বিদায়া: ৭/৫৫)
আর পড়ুন: অপ্রীতিকর আচরণ যেভাবে মোকাবেলা করতেন নবীজি
ইসলামের ইমামগণ একে অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণযোগ্য- ‘আমার মতটি সঠিক, তবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। আর অন্যের মতটি ভুল, তবে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।’
বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে ‘আমারটাই সঠিক’ এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা দুর্বলতা নয়; বরং তা ঈমান, প্রজ্ঞা ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়। রাসুল (স.) ও সাহাবিদের জীবনী থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি পরমত সহিষ্ণুতার চর্চা করি, তবেই সমাজ থেকে বিভেদ ও হিংসা দূর হবে এবং একটি মানবিক সমাজ গঠিত হবে।