ধর্ম ডেস্ক
২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম
ইসলামে পারস্পরিক সহযোগিতা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি এক মহান ইবাদত। মানবিকতা ও ঈমান এখানে একই সুতোয় গাঁথা। একজন মুমিন কখনোই স্বার্থপর হতে পারেন না; বরং পরের কল্যাণেই তার আত্মতৃপ্তি। সৃষ্টির সেবার মাধ্যমেই মূলত স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা পরোপকারকে ঈমানদার হওয়ার অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন- ‘আপনি কি জানেন দুর্গম গিরিপথ কী? (তা হচ্ছে) দাসমুক্তি অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য দান নিকটাত্মীয় ইয়াতীমকে অথবা ধুলামলিন মিসকিনকে। অতঃপর সে মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।’ (সুরা বালাদ: ১২-১৭)
উক্ত আয়াতে নিঃস্ব ও এতিমের উপকার করাকে জান্নাতে যাওয়ার ‘কঠিন পথ’ অতিক্রম করার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা ঈমানের প্রমাণ।
আরও পড়ুন: সবরের বিস্ময়
রাসুলুল্লাহ (স.) বিভিন্ন হাদিসে পরোপকারের অসামান্য ফজিলত বর্ণনা করেছেন-
আল্লাহর দয়া লাভের মাধ্যম: নবীজি (স.) বলেন, ‘দয়াশীলদের ওপর আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, যাতে আকাশের মালিকও তোমাদের প্রতি দয়া করেন।’ (আবু দাউদ: ৪৯৪১)
সর্বোত্তম মানুষ হওয়ার মানদণ্ড: রাসুল (স.) ঘোষণা করেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ সে, যে মানবতার জন্য অধিক কল্যাণকর ও উপকারী।’ (সহিহুল জামে: ৩২৮৯)
মন্দ মৃত্যু থেকে সুরক্ষা: ‘নিশ্চয়ই সদকা অপমৃত্যু রোধ করে।’ (তিরমিজি: ৬৬৪; ইবনে হিব্বান: ৩৩০৯)
আল্লাহর ক্রোধন প্রশমিত করে: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সদকা আল্লাহর ক্রোধকে প্রশমিত করে।’ (তিরমিজি: ৬৬৪; ইবনে হিব্বান: ৩৩০৯)
আখেরাতের সংকট মুক্তি: হাদিসে এসেছে, ‘যে লোক কোনো ঈমানদারের কোনো মসিবত দুর করে দিবে, আল্লাহ তাআলা বিচার দিবসে তার থেকে মসিবত সরিয়ে দিবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)
আরও পড়ুন: ক্ষমা ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য
আল্লাহ তাআলা মানুষকে ধন-সম্পদ বা ক্ষমতা দেন অন্যের উপকার করার জন্য। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
রাসুল (স.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য নিবেদিত এমন অনেক বান্দা আছে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মানুষের উপকার করার জন্য বিশেষ নেয়ামত দান করেন। যতক্ষণ তারা সেগুলো মানবকল্যাণে ব্যয় করে ততক্ষণ তিনি তাদের সেসব নেয়ামতের মধ্যে বিদ্যমান রাখেন। কিন্তু যখন তারা সে উপকার করা বন্ধ করে দেয়, তখন তিনি তাদের থেকে নিয়ামত ছিনিয়ে নিয়ে অন্যদের দিয়ে দেন। (সহিহুত তারগিব: ২৬১৭)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ তাআলা তার যে বান্দাকে কোনো নেয়ামত পরিপূর্ণরূপে দান করেন এবং তারপর লোকদের প্রয়োজন তার দিকে যোগ করে দেন, কিন্তু সে তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার এমন আচরণের ফলে সে ওই নেয়ামত হাতছাড়া করে। (তাবারানি, আওসাত: ৭৫২৯; সহিহুত তারগিব: ২৬১৮)
পরোপকারের ক্ষেত্রে সাহাবিরা ছিলেন প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের অধিকারী। তাবুকের যুদ্ধের সময় ওমর (রা.) তাঁর সম্পদের অর্ধেক দান করলেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) তাঁর পুরো সম্পদ নিয়ে হাজির হলেন। রাসুল (স.) জিজ্ঞেস করলেন, পরিবার-পরিজনদের জন্য কী রেখে এসেছ? তিনি বললেন, ‘তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলকেই রেখে এসেছি।’ (আবু দাউদ: ১৬৮০; তিরমিজি: ৩৬৭৫)। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অন্যের প্রয়োজনে নিজের সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে দেওয়াই ইসলামের শিক্ষা।
আরও পড়ুন: সরলতার বিস্ময়কর প্রতিদান
বর্তমানে আমাদের সমাজ যান্ত্রিকতায় আচ্ছন্ন। অথচ আমাদের আশেপাশেই অনেকে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। পরোপকার মানে শুধু বড় অংকের অর্থদান নয়। ইসলাম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজকেও ইবাদতে রূপ দেয়। যেমন-
আল্লাহ আমাদের জীবিকা ও নেয়ামত দিয়েছেন পরীক্ষার জন্য। তাই আসুন, আমরা ভেদাভেদ ভুলে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসি। কারণ, মানুষের সেবার মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর প্রকৃত ভালোবাসা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে মানবতার কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।