ধর্ম ডেস্ক
১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
ইবাদতের মূল প্রাণশক্তি হলো আল্লাহর জিকির। মুমিনের হৃদস্পন্দন কখনো আল্লাহকে ভুলে থাকতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (স.) জিকিরকারী ও গাফেল ব্যক্তির তুলনা দিতে গিয়ে চমৎকার একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যারা আল্লাহর জিকির করে এবং যারা করে না, তাদের দৃষ্টান্ত হলো যথাক্রমে জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪০৭)
মুমিনের জীবনে জিকিরের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে জিকিরের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করো এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।’ (সুরা আহজাব: ৪১-৪২)
জিকির সহজ হলেও খুবই শক্তিশালী আমল। ব্যবসা-বাণিজ্য, ভ্রমণ, শয়ন কিংবা জাগরণ- জীবনের যেকোনো মুহূর্তে এই আমল করা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা বুদ্ধিমান মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন, ‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহর জিকির করে এবং আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে বলে, হে আমাদের রব! এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯১)
আরও পড়ুন: মহান আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ১৭ আমল
সকল নেক কাজের মধ্যে জিকিরের মর্যাদা অনন্য। হজরত আবু দারদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (স.) সাহাবিদের প্রশ্ন করলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা জানাব না, যা তোমাদের রবের কাছে সবচেয়ে পবিত্র; যা তোমাদের মর্যাদাকে বহু গুণ উঁচুতে নিয়ে যায় এবং যা আল্লাহর পথে সোনা-রুপা ব্যয় করা এমনকি জিহাদের ময়দানে প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার চেয়েও উত্তম?’ সাহাবিগণ আগ্রহভরে জানতে চাইলে নবীজি বললেন, ‘তা হলো আল্লাহর জিকির।’ (তিরমিজি: ৩৩৭৭; ইবনে মাজা: ৩৭৯০)
বান্দা যখন তার রবকে স্মরণ করে, রবও তখন আপন বান্দাকে স্মরণ করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে রাসুল (স.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘আমি বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সাথে আচরণ করি। সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সঙ্গেই থাকি। সে মনে মনে স্মরণ করলে আমিও তাকে গোপনে স্মরণ করি। আর সে যদি কোনো মজলিসে আমার আলোচনা করে, তবে আমি তার চেয়েও উত্তম মজলিসে (ফেরেশতাদের মাঝে) তার আলোচনা করি।’ (বুখারি: ২/৭৪০৫; মুসলিম: ২৬৭৫)
জিকিরের মাধ্যমে বান্দা গুনাহমুক্ত জীবন লাভ করে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেন, ‘যখন একদল মানুষ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় জিকিরে মগ্ন হয়, তখন আসমান থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করেন—তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে এবং তোমাদের পাপগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করা হয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ: ৩/১৪২)
আরও পড়ুন: আল্লাহর ক্ষমা ও বরকতময় জীবন লাভের বিশেষ দোয়া
পৃথিবীতে জিকিরের বৈঠকগুলো মূলত জান্নাতের টুকরো। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন জান্নাতের বাগানের পাশ দিয়ে যাও, তখন সেখানে খুব বিচরণ করো।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! জান্নাতের বাগান কী? তিনি বললেন, ‘জিকিরের মজলিসসমূহ।’ (তিরমিজি: ৩৫১০) অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ‘দুনিয়া ও দুনিয়ার সব বস্তু অভিশপ্ত, তবে আল্লাহর জিকির ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আলেম ও তালেবে ইলম ছাড়া।’ (তিরমিজি: ২৩২২)
কেয়ামতের ভয়াবহ দিনে, যখন সূর্যের তাপে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে, তখন জিকিরকারীরা আল্লাহর আরশের ছায়ায় প্রশান্তি লাভ করবে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা সাত শ্রেণির মানুষকে আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ওই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করেছে এবং আল্লাহর ভয়ে তার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়েছে।’ (বুখারি: ৬৪৭৯)
জান্নাতে প্রবেশের পর জান্নাতবাসীদের মনে কোনো দুঃখ বা অভাব থাকবে না, তবে একটি বিষয় নিয়ে তারা আফসোস করবে। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘জান্নাতবাসীরা দুনিয়ার কোনো জিনিসের জন্য আফসোস করবে না, শুধু ওই সময়ের জন্য আফসোস করবে, যা তারা দুনিয়াতে আল্লাহর জিকির ছাড়া অতিবাহিত করেছে।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ১৬৭৪৬)
সুতরাং, মুমিনের উচিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মহান রবের স্মরণে সজীব রাখা। কারণ জিকিরবিহীন জীবন মৃতদেহের মতো নিস্প্রাণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি জিকির করার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।