images

ইসলাম

ইসলামের মূলভিত্তিতে যেদিন নামাজ যুক্ত হয়েছিল

ধর্ম ডেস্ক

১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

ইসলামের ইতিহাসে মেরাজ বা শবে মেরাজ একটি অলৌকিক ভ্রমণের স্মৃতি ছাড়াও এটি সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন উম্মতে মুহাম্মদির জন্য নামাজকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার ও আবশ্যিক বিধান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ইসলামের অন্যান্য স্তম্ভ (যেমন: রোজা, জাকাত, হজ) জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে ওহি হিসেবে নাজিল হয়েছে, কিন্তু নামাজই একমাত্র ইবাদত যা আল্লাহ তাআলা নবীজি (স.)-কে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে সরাসরি দান করেছেন।

নিচে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সেই ঐতিহাসিক রাতের ঘটনা এবং নামাজের আবশ্যিকতার দালিলিক প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: নবুওয়াতের দশম বা একাদশ বর্ষ

নবুয়তের দশম বছরটি ছিল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্য অত্যন্ত বেদনাবিধুর। একে বলা হয় ‘আমুল হুযন’ বা দুঃখের বছর। এই সময়ে তিনি তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.)-কে হারান। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবকে সান্ত্বনা দিতে এবং ইসলামের ‘মূলভিত্তি’ হিসেবে নামাজ উপহার দিতে তাঁকে ইসরা ও মেরাজের জন্য আমন্ত্রণ জানান।

আরও পড়ুন: কোন আসমানে কার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন মহানবী (স.)

মহন রবের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন

মেরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ (স.) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ পাড়ি দিয়ে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’য় পৌঁছেন। এরপর বায়তুল মামুর এবং এরপর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মধ্যে কোনো মাধ্যম ছাড়াই কথোপকথন হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন- ‘অতঃপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহি করার তা ওহি করলেন।’ (সুরা নজম: ১০)

মুফাসসিরগণের মতে, এই আয়াতের ‘ওহি’র অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু ছিল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। হাদিসে এসেছে, তখন রাসুলুল্লাহ (স.)-কে তিনটি জিনিস দেয়া হয়। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, সুরা বাকারা এর শেষ আয়াত এবং তাঁর উম্মতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক করবে না তাদের জন্য ক্ষমার ঘোষণা। (মুসলিম: ১৭৩)

৫০ ওয়াক্ত থেকে ৫ ওয়াক্ত: হাদিসের বিবরণ

সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে নামাজের বিধান নির্ধারণের ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে এসেছে।

১. প্রাথমিক নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা প্রথমে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য দিন-রাতে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। রাসুলুল্লাহ (স.) তা গ্রহণ করে ফিরে আসছিলেন।

২. মুসা (আ.)-এর পরামর্শ: ফেরার পথে ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি বলেন, ‘আপনার উম্মত দুর্বল, তারা দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং রবের কাছে কমিয়ে আনার আবেদন করুন।’

৩. নামাজ হ্রাসকরণ: রাসুলুল্লাহ (স.) এভাবে কয়েকবার আল্লাহ ও মুসা (আ.)-এর মধ্যে আসা-যাওয়া করেন। প্রতিবার আল্লাহ কিছু সংখ্যা কমিয়ে দেন। 

অবশেষে আল্লাহ তাালা বলেন- ‘হে মুহাম্মদ! দিন-রাত্রিতে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রইল। কিন্তু এর সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তেরই দেওয়া হবে। আমার কথার কোনো নড়চড় হয় না।’ (সহিহ বুখারি: ৩৪৯)

আরও পড়ুন: মেরাজ: সাত আসমান পেরিয়ে আল্লাহর দিদার লাভের অসাধারণ গল্প

ইসলামের মূলভিত্তি হিসেবে নামাজের অন্তর্ভুক্তি

নামাজ যে ইসলামের নিছক কোনো আমল নয়, বরং এটি যে দ্বীনের ‘মূলভিত্তি’ বা পিলার, তা মেরাজের এই ঘটনার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে মদিনায় হিজরতের পর অন্যান্য বিধান নাজিল হলেও, নামাজের ভিত্তি মক্কি জীবনেই মেরাজের রাতে স্থাপিত হয়।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত হাদিসে জিবরাঈল (আ.)-এর প্রশ্নের জবাবে রাসুল (স.) বলেন- ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর স্থাপিত... (তন্মধ্যে ঈমানের পরেই নামাজের স্থান)।’ (সহিহ বুখারি: ৮)

কেন এই রাতটি ইসলামের ইতিহাসে ‘টার্নিং পয়েন্ট’?

১. আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগ: নামাজকে বলা হয় ‘মুমিনের মেরাজ’। মেরাজের রাতে নবীজি যেমন আল্লাহর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, মুমিনরা নামাজের মাধ্যমে সেই সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পায়।
২. হিসাবের শুরু: কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। যার নামাজ ঠিক, তার সব ঠিক। এই বিধানটি মেরাজের রাতেই চূড়ান্ত হয়েছিল।
৩. ঈমান-কুফর পার্থক্যকারী ইবাদত: বান্দা এবং শিরক-কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত (সহিহ মুসলিম: ৮২)। এই রাতে সেই সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছিল।

মেরাজের রাতটি ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যেদিন উম্মতে মুহাম্মদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার লাভ করে। ৫০ ওয়াক্তের সওয়াব ৫ ওয়াক্তের মধ্যে নিহিত করে আল্লাহ তাআলা এই ইবাদতকে ইসলামের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো অপরিহার্য করে দিয়েছেন। তাই বলা যায়, যেদিন নামাজ নির্ধারিত হয়েছিল, সেদিনই ইসলামের আধ্যাত্মিক কাঠামো পূর্ণতা পাওয়ার পথে প্রধান ধাপ অতিক্রম করেছিল। নামাজ কেবল একটি হুকুম নয়, এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রেমের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, যা সেই রাতে আরশে আজিমে বাঁধা হয়েছিল।