ধর্ম ডেস্ক
১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
‘নানা মুনির নানা মত’ প্রবাদটি মানবজীবনের এক চিরন্তন বাস্তবতা। মানুষের বিবেক, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির ভিন্নতার কারণে সমাজে মতের অমিল সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ইসলাম মানুষের এই সৃষ্টিগত বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি; বরং একে একধরনের ‘পরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
আল্লাহ তাআলা চাইলে সব মানুষকে একই মত ও পথের অনুসারী করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, যাতে মানুষ সত্য অন্বেষণে সচেষ্ট হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান।’ (সুরা মায়েদা: ৪৮)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে।’ (সুরা হুদ: ১১৮)
তবে ইসলাম এমন কোনো মতভেদকে অনুমোদন দেয় না, যা উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরায় বা ফিতনা সৃষ্টি করে। কোরআন ও সুন্নাহর সীমার মধ্যে থাকা যৌক্তিক ‘মতপার্থক্য’ (ইখতিলাফ) গ্রহণযোগ্য; কিন্তু ‘বিভেদ’ (ইফতিরাক) বা দলাদলি সম্পূর্ণ হারাম। ইসলামে মতভেদ নিরসনের কিছু সোনালি নীতিমালা রয়েছে, যা মেনে চললে সমাজ থেকে বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব।
মুমিনদের মধ্যে কোনো বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে ব্যক্তিগত জেদ, দলীয় অবস্থান বা সামাজিক চাপকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। বরং কোরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসাই হলো ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন- ‘যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তবে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও... এটিই উত্তম এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম।’ (সুরা নিসা: ৫৯)
আরও পড়ুন: ঐক্য গড়ার যে উপায় হাতে-কলমে শিখিয়েছে ইসলাম
মতভেদ থাকলেও হৃদয়ের মিল ও উম্মাহর ঐক্য নষ্ট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইসলামে ঐক্য ফরজ, আর অনৈক্য ফিতনা। আল্লাহ তাআলা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন- ‘তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান: ১০৩)
তিনি আরও সতর্ক করেছেন, ‘তাদের মতো হয়ো না, যারা সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১০৫)
যেসব বিষয়ে কোরআন–সুন্নাহতে সরাসরি স্পষ্ট নির্দেশ নেই, সেখানে আলেমদের গবেষণালব্ধ (ইজতিহাদি) ভিন্নমত বৈধ। এমন মতভেদে কেউ ভুল করলেও আল্লাহ তাকে সওয়াব দেন। নবীজি (স.) বলেন- ‘ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে দুটি সওয়াব, আর ভুল করলে একটি সওয়াব।’ (সহিহ বুখারি: ৭৩৫২)
এর ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো বনু কুরায়জার ঘটনা। সেখানে ‘আছরের নামাজ কখন আদায় করা হবে’ তা নিয়ে সাহাবিরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। নবীজি (স.) কাউকেই তিরস্কার করেননি। (সহিহ বুখারি: ৯৪৬)
নিজের মতকেই একমাত্র ‘হক’ মনে করা এবং অন্যের মতকে তুচ্ছজ্ঞান করা ইসলামের শিক্ষা নয়। হজরত মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা আমাদের শেখায় যে, বাহ্যদৃষ্টিতে যা ভুল মনে হয়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বা গভীর জ্ঞানে তা সঠিকও হতে পারে। (দ্রষ্টব্য: সুরা কাহফ)। তাই মতভেদ নিরসনে ধৈর্য ও সহনশীলতাই মুমিনের ভূষণ।
আরও পড়ুন: ঝগড়া এড়িয়ে চলার পুরস্কার অনেক বড়
বিতর্ক নয়, বরং আন্তরিক আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- ‘আর তাদের কার্যাবলি পরস্পর পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।’ (সুরা আশ-শূরা: ৩৮)
আলোচনার সময় কটু কথা ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গি পরিহার করতে হবে। কারণ আল্লাহ বলেন- ‘আমার বান্দাদের বলুন, তারা যেন উত্তম কথা বলে। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৫৩)
মতভেদের ক্ষেত্রে আবেগ, মাজহাব বা দলের অন্ধ অনুসরণ কাম্য নয়। বরং কোরআন ও সুন্নাহর শক্তিশালী দলিল যেদিকে, সেদিকেই নিজেকে সঁপে দেওয়া জ্ঞানীদের কাজ। কোরআনের ভাষায়- ‘যারা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম, তা অনুসরণ করে, তারাই প্রকৃত জ্ঞানী।’ (সুরা যুমার: ১৮)
আরও পড়ুন: ইসলামের প্রসার দ্রুত বাড়ছে, মুসলমানদের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
অধিকাংশ বিরোধের মূলে থাকে ‘ইগো’, স্বার্থ কিংবা হিংসা। ন্যায়বিচারের স্বার্থে ইসলাম এসব পরিহারের নির্দেশ দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে।’ (সুরা মায়েদা: ৮)
একে অপরের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হবে দরদি বন্ধুর মতো। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘মুমিন মুমিনের জন্য আয়নার মতো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯১৮)
অর্থাৎ, আয়না যেমন কোনো দাগ বা ময়লা দেখলে তা নিঃশব্দে দেখিয়ে দেয়, তেমনি মুমিনরাও একে অপরের ভুল শুধরে দেবে; বিদ্বেষ বা শত্রুতা দিয়ে নয়।
কখনো কখনো বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে ব্যক্তিগত মত বা অধিকার ছাড় দিতে হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে নবীজি (স.) সাহাবিদের আবেগ সত্ত্বেও কাফেরদের শর্ত মেনে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র সুদূরপ্রসারী কল্যাণের জন্য। এটিই ইসলামের দূরদর্শিতা।
মোটকথা, মতপার্থক্য সমস্যা নয়, সমস্যা হলো তা পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে। মতবিরোধকে শত্রুতার হাতিয়ার না বানিয়ে সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যম বানাতে হবে। ইখলাস, তাকওয়া ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখলে মতভেদ সত্ত্বেও ঐক্য অটুট রাখা সম্ভব। বিশেষত বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতভেদ প্রকাশের সময় এই নীতিমালাগুলো অনুসরণ করা বড় প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদের সেই প্রজ্ঞা ও তাওফিক দান করুন। আমিন।