images

ইসলাম

জানাজার নামাজে সুরা ফাতেহা: ফরজ নয় কেন?

ধর্ম ডেস্ক

০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

ইসলামে জানাজার নামাজ একটি বিশেষ ইবাদত, যার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ ও দোয়া করা। জানাজার নামাজে সুরা ফাতেহা পাঠ করা ফরজ বা আবশ্যক কি না- এ নিয়ে মুসলিম উম্মাহর ফকিহদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন তাত্ত্বিক মতামত রয়েছে। তবে কোরআন, সহিহ হাদিস এবং সাহাবা-তাবেয়িদের আমল ও খাইরুল কুরুনের (উত্তম যুগ) কর্মধারা বিশ্লেষণ করলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী সমাধান পাওয়া যায়।

জানাজার হাকিকত: নামাজ নাকি দোয়া?

জানাজার নামাজের প্রকৃতি সাধারণ নামাজের চেয়ে ভিন্ন। এতে রুকু, সেজদা, বৈঠক ও তাশাহহুদ নেই। জমহুর ফকিহদের মতে, এটি মূলত মায়্যেতের জন্য একটি সামষ্টিক দোয়া।

ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, ‘ইন্নামা হুয়াদ দুআ- ‘জানাজা তো মূলত দোয়াই’। (আল-মুদাওওয়ানা: ১/২৫১) 

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন- ‘নবী কারিম (স.) থেকে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি জানাজার নামাজে সুরা ফাতেহা পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এর সনদ সহিহ নয়। (জাদুল মাআদ: ১/৪৮৬)

প্রখ্যাত তাবেয়ি আবুল আলিয়া (রহ.) বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমার তো ধারণাও ছিল না যে, রুকু-সেজদাহীন নামাজে সুরা ফাতেহা পাঠ করা হবে!’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১১৫২৪)

আরও পড়ুন: জানাজার খাটিয়া বহনের সময় করণীয়

হাদিসের নির্দেশনা: দোয়া ও ইখলাস

রাসুলুল্লাহ (স.) জানাজার নামাজে কোরআন তেলাওয়াত করার কোনো নির্দিষ্ট বা আবশ্যকীয় নির্দেশ দেননি। বরং তিনি বলেছেন- ‘তোমরা যখন মৃতের জানাজা পড়, তখন ইখলাসের সঙ্গে তার জন্য দোয়া করো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩২০১)
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জানাজার নামাজে নির্ধারিত কোনো কিরাত বা দোয়া নেই; বরং উত্তম দোয়া করাই উদ্দেশ্য। (বাদায়েউস সানায়ে: ১/৩১৩)

সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত আমল

জানাজার নামাজে সুরা ফাতেহা পাঠ না করার বিষয়টি বড় বড় সাহাবিদের আমল থেকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রমাণিত।
১. হজরত আলী (রা.): তিনি জানাজায় হামদ (আল্লাহর প্রশংসা), দরুদ ও দোয়া করতেন, সুরা ফাতেহা বা কেরাত পড়তেন না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১১৪৯৪)
২. হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.): বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত যে, তিনি জানাজার নামাজে কোরআন তেলাওয়াত করতেন না। (মুয়াত্তা মালেক: ৫২৩; মুসান্নাফ আবি শাইবা: ১১৫২২)
৩. হজরত আবু হুরায়রা (রা.): তিনি জানাজার যে পদ্ধতি শিখিয়েছেন, তাতে তাকবির, হামদ, দরুদ ও দোয়ার কথা রয়েছে, সুরা ফাতেহার উল্লেখ নেই। (মুয়াত্তা মালেক: ৫২১)
৪. হজরত উবাদা ইবনে ছামিত (রা.): যিনি সাধারণ নামাজে সুরা ফাতেহার প্রবক্তা ছিলেন, তিনিও জানাজার পদ্ধতিতে সুরা ফাতেহার কথা উল্লেখ করেননি। (সুনানে কুবরা বায়হাকি: ৪/৪০)

আরও পড়ুন: পানিতে ডুবে মারা গেলে জানাজা ও দাফনের নিয়ম কী

তাবেয়িদের আমল ও মদিনা-কুফার ঐতিহ্য

ইসলামের দুই প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র মদিনা ও কুফাতে জানাজায় সুরা ফাতেহা পড়ার কোনো প্রচলন ছিল না। মদিনার ইমাম মালেক (রহ.) এবং কুফার ইমাম সুফিয়ান ছাওরি (রহ.)-সহ প্রখ্যাত তাবেয়ী আতা ইবনে আবি রাবাহ, ইবনে সিরিন, শাবি ও ইবরাহিম নাখায়ি (রহ.) জানাজায় সুরা ফাতেহা পাঠের আবশ্যকতাকে অস্বীকার করেছেন। (উমদাতুল কারি: ৮/১৩৯)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর আমল ও সমন্বয়

সহিহ বুখারিতে (হাদিস: ১৩৩৫) বর্ণিত আছে, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) জানাজায় সুরা ফাতেহা পড়ে বলেছিলেন, ‘যাতে লোকেরা জানতে পারে এটি সুন্নাহ।’
এর সঠিক ব্যাখ্যা হলো- মুহাদ্দিসগণ ও ফকিহদের মতে, তিনি সুরা ফাতেহা ‘কেরাত’ (কোরআন তেলাওয়াত) হিসেবে নয়, বরং ‘হামদ ও দোয়া’ হিসেবে পাঠ করেছিলেন। সুরা ফাতেহার মধ্যে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়ার চমৎকার সমন্বয় রয়েছে। তাই কেউ যদি দোয়ার নিয়তে সুরা ফাতেহা পড়ে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু এটি ফরজ বা আবশ্যক হওয়ার দলিল নয়। ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন, ইবনে আব্বাস (রা.) এখানে সুরা ফাতিহা কিরাআত হিসেবে নয়; বরং হামদ ও দোয়া হিসেবে পাঠ করেছেন। (শরহু মাআনিল আসার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৯৫)

আরও পড়ুন: জানাজার নামাজে ভুলে ৫ তাকবির দিলে করণীয় কী?

ফকিহদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হানাফি মাজহাবসহ খাইরুল কুরুনের অধিকাংশ ওলামাদের মতে, জানাজার নামাজে সুরা ফাতেহা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। জানাজার নামাজের ফরজ মাত্র দুটি- ১. চারটি তাকবির বলা। ২. সক্ষম হলে দাঁড়িয়ে আদায় করা।
কেউ যদি সানা, দরুদ ও দোয়ার মাধ্যমে জানাজা আদায় করেন, তবে তার নামাজ পূর্ণাঙ্গ ও সহিহ হবে। সুরা ফাতেহা না পড়লে জানাজা হয় না—এই দাবিটি জমহুর সাহাবা ও তাবেয়িদের আমলের পরিপন্থী।

কোরআন, হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপক আমলের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, জানাজার নামাজ মূলত একটি শাফাআত বা সুপারিশমূলক দোয়া। সুরা ফাতেহা না পড়লেও জানাজার নামাজ পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় হয়। ইসলামি শরিয়তের এই প্রশস্ততাকে সংকীর্ণ করার অবকাশ নেই। তাই ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে উম্মাহর ঐক্যের খাতিরে একে অপরকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয়।