images

ইসলাম

আরাফার বিশেষত্ব নিয়ে যা বলেছেন বিশ্বনবী (স.)

ধর্ম ডেস্ক

০৮ জুলাই ২০২২, ১২:৪৪ পিএম

পবিত্র মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানের অবস্থান। এর দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যথাক্রমে দুই কিলোমিটার। আরাফাত শব্দটি আরবি। অর্থ জানা, চেনা, পরিচয় লাভ করা, অবহিত হওয়া, স্বীকার করা, স্বীকৃতি দান করা ইত্যাদি।

জিবরাঈল (আ.) যখন ইবরাহিম (আ.)-কে মসজিদে নামিরার পাশে হজের বিধি-বিধান শিক্ষা দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করেন, ‘হাল আরাফতা’ অর্থাৎ ‘আপনি কি বুঝতে পেরেছেন’? হজরত ইবরাহিম (আ.) বলেন, হ্যাঁ। এ থেকে ময়দানটির নাম হয়ে গেছে আরাফাত। তবে কোনো স্কলার বলেন, মহান আল্লাহ হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাত থেকে সিংহলে এবং হাওয়া (আ.)-কে জেদ্দায় নিক্ষেপ করেন। সাড়ে তিন শ বছর দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এ মাঠে তাঁদের পরিচয় ঘটে বলে এর নাম হয়ে যায় আরাফাত। কারো মতে, হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে পাপের স্বীকৃতি দান করেন বলে এ ময়দানকে আরাফাতের ময়দান বলা হয়। 

মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কল্যাণে যেসব দিবস দান করেছেন তার মধ্যে আরাফার দিন অন্যতম। এই দিনকে কোরআনে ‘মাশহুদ’ বলা হয়েছে এবং এর কসম খাওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর কসম সাক্ষ্যদাতার এবং যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া হবে তার।’ (সুরা বুরুজ: ৩)

হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা: জিলহজের ৯ তারিখকে বলা হয় আরাফা দিবস। হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা আরাফার দিনকে ঘিরে। হজের সময় আরাফাতের মাঠে অবস্থান করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘আরাফাতে অবস্থান করাই হলো হজ’ (সুনানে নাসায়ি: ৩০৪৪ )। আরাফার ময়দানে শূন্য মস্তকে সেলাইবিহীন বস্ত্র পরিহিত লাখো আল্লাহপ্রেমীর কান্নার আওয়াজ এদিন আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে।  লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক—‘হে আল্লাহ! বান্দা হাজির, বান্দা হাজির’ বলে আল্লাহর ঘরে হাজিরা দানকারী বান্দারা এদিন আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে রাব্বুল আলামিনের দরবারে কাতর হয়ে ফরিয়াদ জানায়। 

উরওয়া ইবন মুদারিস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মুজদালিফায় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তাঈ গোত্রের দুই পাহাড় থেকে এসেছি। আর আমি কোনো পাহাড়ে অবস্থান বাদ দিইনি; এমতাবস্থায় আমার কি হজ আদায় হয়েছে? রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে এই সালাত আদায় করেছে আর এর আগে আরাফায় অবস্থান করেছে—দিনে বা রাতে, তার হজ পূর্ণ হয়েছে এবং সে তার ইহরাম শেষ করেছে। (নাসায়ি : ৩০৪৪)

ইসলামকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণার দিন: দশম হিজরি সনে এই ময়দানে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) পবিত্র হজ উপলক্ষে তাঁর শেষ ভাষণ দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে যা বিদায় হজের ভাষণ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আল্লাহ তাআলা এ দিনকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। দীন-ইসলাম পূর্ণতার ঘোষণা দিয়েছেন এ দিনেই। এ দিনেই অবতীর্ণ হয়েছে কোরআনে কারিমের সর্বশেষ আয়াত, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলাম তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।’ (সুরা মায়েদা: ৩)

বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন: আরাফার দিনটি ইসলামে এত মর্যাদাপূর্ণ যে রাসুলুল্লাহ (স.) এটাকে ঈদের দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উকবাহ বিন আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আরাফাতের দিন, কোরবানির দিন এবং তাশরিকের দিনগুলো হচ্ছে ইসলামে আমাদের ঈদের দিন। এই দিনগুলো হচ্ছে পানাহারের দিন। (আবু দাউদ: ২৪২১)

ক্ষমা লাভের দিন: আরাফাত দিনে বান্দার দিকে আল্লাহর রহমতের জোয়ার প্রবলবেগে উৎসারিত হয়। অসংখ্য বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে থাকেন এই দিনে। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন—

‘আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত বেশি পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। এই দিন আল্লাহ দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন। আল্লাহ বলেন, কী চায় তারা?’ (মুসলিম: ১৩৪৮)

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তাআলা নিকটতম আসমানে আসেন এবং পৃথিবীবাসীকে নিয়ে আসমানের অধিবাসী অর্থাৎ ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করেন। 

বলেন, দেখো— আমার বান্দারা উষ্কখুষ্ক চুলে, ধুলোয় মলিন বদনে, রোদে পুড়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে সমবেত হয়েছে। তারা আমার রহমতের প্রত্যাশী। অথচ তারা আমার আজাব দেখেনি। ফলে আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত বেশি পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। (ইবনে হিব্বান: ৩৮৫৩)

এক রোজায় দুই বছরের গুনাহ মাফ: এই দিনের একটি রোজায় বান্দার দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, আরাফার দিনের (৯ জিলহজের) রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে, তিনি আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। (মুসলিম: ১১৬২)

আরাফাতের দিনের দোয়া শ্রেষ্ঠ দোয়া: হাদিসে আরাফাতের দিনের দোয়াকে শ্রেষ্ঠ দোয়া বলা হয়েছে। নবীজি (স.) বলেন, শ্রেষ্ঠ দোয়া আরাফাতের দোয়া। দোয়া হিসেবে সর্বোত্তম হলো ওই দোয়া, যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীরা করেছেন। তা হলো—‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়ইন কাদির।’ অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁর জন্য, আর তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (তিরমিজি: ৩৫৮৫)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আরাফার মাঠ ও আরাফার দিনের গুরুত্ব বোঝার এবং যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। প্রত্যেক হাজিকে হজে মাবরুর নসিব করুন। আমিন।