images

ইসলাম

নবী-কটূক্তির বিশ্বব্যাপী খেলা: কেন এই উসকানি বাড়ছে এবং মুসলমান কী করবে

ধর্ম ডেস্ক

২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০২:০১ পিএম

ইসলাম, কোরআন এবং মহানবী (স.)–কে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে অবমাননাকর মন্তব্য, ব্যঙ্গচিত্র ও ইসলামবিরোধী প্রচারণা বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ড আকস্মিক নয়; বরং সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই এগুলো পরিচালিত হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবীজি (স.)–এর বিরুদ্ধে কটূক্তির পেছনে তিনটি প্রভাবশালী কারণ রয়েছে।

১. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে মুসলিমদের জান-মাল ধ্বংস করা

ইসলামবিরোধীরা পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ঈমানি অনুভূতি লক্ষ্য করে মন্তব্য ছোড়ে, যাতে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। এরপর সেই ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিকভাবে তাদের দমন করা সহজ হয়। এর বাস্তব উদাহরণ হলো- ভারতে নূপুর শর্মা ও নবীন কুমার জিন্দালের মন্তব্যের পর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে মুসলমানরা পুলিশি গুলি, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার ও বাড়িঘর ধ্বংসের শিকার হন। অথচ অপরাধীরা আজও দণ্ডমুক্ত। ফ্রান্সে শার্লি এবদোর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর মুসলিমদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, মসজিদ বন্ধ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়। স্পষ্টতই উদ্দেশ্য- মুসলমানদের উত্তেজিত করে দমননীতিকে বৈধতা দেওয়া।

২. ইসলামের বিস্তার ঠেকানো ও মানুষকে ইসলামগ্রহণ থেকে বিরত রাখা

ইসলামের মানবিকতা, যুক্তিপূর্ণ শিক্ষা ও বিশুদ্ধ তাওহিদ বিশ্বব্যাপী মানুষের হৃদয় আকর্ষণ করছে। ফলে দ্রুত হারে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। এটি তাদের চোখে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিভিন্ন ধর্মের গবেষক ডা. জাকির নায়েক ও আহমেদ দিদাদের মতো দাঈদের যৌক্তিক ধর্মবিশ্লেষণে বহু শিক্ষিত অমুসলিম সত্য অনুসন্ধান করতে পেরেছেন। বিষয়টি টের পেয়ে তারা ইসলামের বিস্তার ঠেকাতে চায়। আল্লাহ বলেন. ‘তারা আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করবেনই।’ (সুরা সাফ: ৮)

ইতিহাসও দেখায়, যত বাধা এসেছে, ইসলাম ততই প্রসারিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অবমাননাকারীর শাস্তি: চার মাজহাবের ফতোয়া

৩. রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ হাসিল করা

অনেক দেশে ইসলামবিরোধী বক্তব্য এখন জনপ্রিয়তা অর্জন, ভোট ব্যাংক শক্ত করা এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রশংসা পাওয়ার সহজ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। যেমন- ভারতের রাজনীতিতে বহু নেতার উত্থান হয়েছে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যকে পুঁজি করে। যোগী আদিত্যনাথের অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ; যেখানে ধর্মীয় উত্তেজনা রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রধান শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের করণীয়

পরিস্থিতির উত্তাপে আবেগ হারিয়ে প্রতিক্রিয়া জানালে ইসলামবিরোধীদের পরিকল্পনাই সফল হয়। তাই শরিয়তসম্মত ও কার্যকর নীতিমালা অনুসরণ জরুরি। আসুন জেনে নিই শরিয়াহ প্রতিষ্ঠিত নেই—এমন দেশগুলোতে প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত।

১. ইসলামকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য করো, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সূরা মুহাম্মদ: ৭)

রাসুল (স.) বলেন, ‘তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করবে; না করলে আল্লাহ তোমাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন।’ (তিরমিজি: ২১৬৯)

আরও পড়ুন: নবীজিকে নিয়ে কটূক্তি, সন্তানকে ত্যাজ্য করলেন বাবা

২. শান্তিপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রতিবাদ, গণমাধ্যমে সত্য প্রচার

অহিংস প্রতিবাদ, প্রমাণভিত্তিক বক্তব্য, নবী (স.)–এর জীবনী ও চরিত্রবিষয়ক বই বিতরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্য প্রচার—এসবই কার্যকর ও ইতিবাচক ফল দেয়।

৩. আবেগতাড়িত হয়ে অযৌক্তিক পদক্ষেপ পরিহার

আইন হাতে নেওয়া, সহিংসতা, ভাঙচুর—এসব প্রতিপক্ষকে দমনপীড়নের অজুহাত দেয়। মুসলমানদের উচিত- আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানানো।

৪. অর্থনৈতিক বয়কট চাপ সৃষ্টির কার্যকর উপায়

নূপুর শর্মা ইস্যুর পর আরব বিশ্বে ভারতীয় পণ্যবর্জন প্রচারণায় যে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তা কূটনৈতিক পর্যায়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আনে।

৫. ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর উপর ভরসা

আল্লাহ বলেন- ‘আপনার পূর্বেও বহু রাসূলকে মিথ্যা বলা হয়েছিল; কিন্তু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।’ (সুরা আনআম: ৩৪)

ইতিহাস সাক্ষী- ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল প্রমুখ সত্যের বিরোধীরাই শেষপর্যন্ত ধ্বংস হয়েছে।

আরও পড়ুন: দ্বীন প্রচার থামাতে যেভাবে নির্যাতন করত আবু জাহেলরা

৬. বিশুদ্ধ ঈমান ও শিরকমুক্ত বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা

আল্লাহ বলেন- ‘যারা ঈমান আনে এবং শিরক দ্বারা তাদের ঈমান কলুষিত করে না, নিরাপত্তা শুধু তাদেরই জন্য।’ (সুরা আনআম: ৮২)

শরিয়তের দৃষ্টিতে কটূক্তিকারীর শাস্তি: এখতিয়ার কাদের?

ইতিহাসে দেখা যায়— কাব ইবন আশরাফ (বুখারি: ২৫১০), আবু রাফি (বুখারি: ৩০২২), অন্ধ সাহাবির দাসী হত্যার ঘটনা (আবু দাউদ: ৪৩৬১) এসব ঘটনায় নবীজি (স.)–এর শানে কটূক্তিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে শরিয়ত স্পষ্টভাবে বলে—শাস্তি কার্যকর করার এখতিয়ার রাষ্ট্র বা শাসকের হাতে। ব্যক্তিগতভাবে এমন দণ্ড প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। (ফতোয়া লাজনা দায়িমাহ: ২২/৫–১০)

মোটকথা, নবীজি (স.) ও আল্লাহর বিরুদ্ধে কটূক্তি নতুন কিছু নয়। উদ্দেশ্যগুলোও স্পষ্ট- মুসলমানদের উত্তেজিত করা, ইসলামের বিস্তার বাধাগ্রস্ত করা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল। এ পরিস্থিতিতে সকল মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ থাকা, প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করে আইনগত ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় প্রতিক্রিয়া জানানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ- যে যা-ই করুক, সত্য চিরকাল টিকে থাকে, আর মিথ্যার পরাজয় নিশ্চিত।