ধর্ম ডেস্ক
২১ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৮ পিএম
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আজকাল মানুষ শুধু ‘প্রকৃতির রোষ’ বা বৈজ্ঞানিক কারণ বলে পাশ কাটিয়ে যায়। কিন্তু কোরআন ও ইতিহাসের পাতায় এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক সরাসরি সতর্কবার্তা। যখন কোনো জাতি আল্লাহকে ভুলে যায়, শিরক, অহংকার ও পাপাচারে ডুবে যায়, তখনই নেমে আসে এই গজব। চলুন দেখে নিই, ইতিহাসের সেইসব মর্মান্তিক অধ্যায় থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
লুত (আ.)-এর জাতি যখন সমকামিতাকে তাদের জীবনের অংশে পরিণত করল, আল্লাহ তাদের উপর নিয়ে এলেন ভয়ংকর ভূমিকম্প। শুধু তাই নয়, আকাশ থেকে পড়ল পোড়ামাটির পাথর। মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেল এক সম্পূর্ণ সভ্যতা। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমার আদেশ এসে গেল, তখন আমি সেই জনপদকে ওপর-নিচ উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর বর্ষণ করলাম পোড়ামাটির পাথর।’ (সুরা হুদ: ৮২)
৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েও যখন নুহ (আ.)-এর জাতি সত্য মানতে অস্বীকৃতি জানাল, তখন আল্লাহর গজব এলো মহাপ্লাবন আকারে। আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি এবং মাটি থেকে পানির উৎসধারা একত্রিত হলো। শুধু সেই মুমিনরাই বাঁচলেন, যারা নুহ (আ.)-এর নৌকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বর্ষণে, আর ভূমি উদগীরণ করল উৎসধারা। পানি মিলিত হলো এক নির্ধারিত কাজে।’ (সুরা কামার: ১১–১২)
আরও পড়ুন: নুহ (আ.)-এর যে দোয়ায় পুরো জাতি ধ্বংস হয়েছিল
আদ জাতি ছিল শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিশাল প্রাসাদ নির্মাণে অহংকারী। তাদের ঔদ্ধত্যের কারণে আল্লাহ একটানা সাত রাত আট দিন ধরে প্রলয়ঙ্করী ঝড় পাঠালেন। সেই ঝড়ে উড়ে গেল তাদের অহংকার, ধ্বংস হয়ে গেল তাদের সভ্যতা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের উপর পাঠিয়েছিলাম অকল্যাণের বাতাস, যা যার উপর এসেছিল তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে।’ (সুরা জারিয়াত: ৪১–৪২)
সামুদ জাতি পাহাড় কেটে মজবুত ঘর বানাতো এবং নিজেদের নিরাপদ ভাবত। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর নিদর্শন উষ্ট্রীকে হত্যা করল, তখন এলো ভয়াবহ শব্দের আঘাত। সেই শব্দে তাদের অন্তর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল এবং তারা ঘরে উপুড় হয়ে মরে রইল। আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে গ্রাস করেছিল ভয়ংকর শব্দঘাত।’ (সুরা হাক্কাহ: ৫)
ইউসুফ (আ.)-এর সময়ে মিসরে সাত বছর ধরে চলেছিল ভয়াবহ খরা। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আগাম পরীক্ষা এবং সতর্কবার্তা। আল্লাহ বলেন, ‘এরপর আসবে সাত বছর কঠিন দুরাবস্থা।’ (সুরা ইউসুফ: ৪৮)
আরও পড়ুন: কূপে নিঃসঙ্গ ইউসুফ (আ.): জিব্রাইলের যে বার্তা বদলে দিল সবকিছু
ইয়েমেনের সাবা জাতি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী, কিন্তু তারা আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞ হলো। এই অকৃতজ্ঞতার শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাদের ‘আরিমের বন্যা’ দিয়ে শাস্তি দিলেন। তাদের বিশাল বাঁধ ভেঙে গেল, আর সব ফল-ফসলের বাগান তেতো ফলে পরিণত হলো। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের ওপর প্রেরণ করলাম ‘আরিমের বন্যা’ এবং তাদের দুটিকে উদ্যানগুলোকে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুটি উদ্যানে, যাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউ গাছ এবং সামান্য কিছু কুল গাছ।’ (সুরা সাবা: ১৬)
মাদইয়ানবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে মাপে-ওজনে কারচুপি করত। এই পাপাচারের কারণে আল্লাহ তাদের ওপর ভয়ংকর শব্দঘাত ও ভূমিকম্পের শাস্তি পাঠালেন। আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে পাকড়াও করল বিকট আওয়াজ। ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকল।’ (সুরা হুদ: ৯৪)
ফেরাউন যখন নিজেকে ‘সর্বোচ্চ প্রভু’ বলে অহংকার করল, তখন আল্লাহ তাকে এবং তার সৈন্যদের সমুদ্রে ডুবিয়ে মারলেন। তবে তার দেহকে রক্ষা করে দিলেন, যাতে সে পরবর্তী যুগের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আজ তোমার দেহকে রক্ষা করব, যাতে তুমি পরবর্তী যুগের জন্য নিদর্শন হও।’ (সুরা ইউনুস: ৯২)
আরও পড়ুন: ফেরাউনের ডুবে মরার ঐতিহাসিক মুহূর্ত: কোরআন ও হাদিসের আলোকে
কাবা ঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসা আবরাহার বিশাল হাতি বাহিনীকে আল্লাহ ধ্বংস করে দেন। তিনি তাদের উপর পাখি পাঠালেন, যারা নিক্ষেপ করল পোড়ামাটির পাথর। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তাদের উপর প্রেরণ করেছিলেন পাথরযুক্ত কঙ্কর নিক্ষেপকারী পাখির দল।’ (সুরা ফীল: ৩–৪)
ইতিহাসের এই করুণ পরিণতিগুলো আমাদের জন্য এক জ্বলন্ত শিক্ষা। আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন, এই বিপর্যয় মানুষেরই কৃতকর্মের ফল- ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে সমুদ্রে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তাদেরকে কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রূম: ৪১)
আল্লাহ কখনোই অত্যাচারী জাতিকে রেহাই দেন না। আমাদের উচিত এই সতর্কবার্তাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া, তওবা করা এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসা। কারণ মুক্তির পথ একটাই—আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাইবে, তখন তিনি আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন।’ (সুরা হুদ: ৫২)
বিশেষ বার্তা: এই লেখাটি পড়ে যদি মনে হয় আপনারও তওবা করা উচিত, তাহলে এই লেখা সার্থক। আজই আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চান, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল এবং দয়াবান।