ধর্ম ডেস্ক
০৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:৪৬ পিএম
ইসলামের ইতিহাসে কিছু ঘটনা এমন আছে, যা ঈমান ও ধৈর্যের অটল উদাহরণ হয়ে আছে যুগে যুগে। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও স্বৈরাচারী শাসক নমরুদের ঘটনাটি তেমনই এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত, যা আজও মুমিনের অন্তরে ঈমানের প্রদীপ জ্বালায়।
নমরুদ ছিল তৎকালীন এক অহংকারী রাজা, যে নিজেকে ইলাহ বলে দাবি করত। অথচ আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.) মানবজাতিকে আহ্বান জানালেন এক আল্লাহর ইবাদতে; তাওহিদের বার্তায়। তিনি যখন মূর্তি ভেঙে তাওহিদের দাওয়াত দিলেন, তখন নমরুদের সঙ্গে তাঁর তীব্র বিতর্ক হয়।
কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আপনি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেননি, যে ইবরাহিমের সঙ্গে তার রব সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন? যখন ইবরাহিম বললেন, ‘আমার রব তিনিই, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান’, সে বলল, ‘আমিও জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।’ ইবরাহিম বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি সেটিকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করাও।’ ফলে কাফের হতবুদ্ধি হয়ে গেল।’ (সুরা বাকারা: ২৫৮)
আরও পড়ুন: মুসা (আ.)-এর কবুল হওয়া ৪ দোয়া
বিতর্কে পরাজিত হয়ে নমরুদ ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপের আদেশ দিল। লোকেরা পর্বতের মতো কাঠ জমিয়ে বিশাল গর্তে আগুন জ্বালাল। যখন নবী ইবরাহিম (আ.)-কে নিক্ষেপযন্ত্রে (মিনজানিক) বেঁধে আগুনে ছোড়া হলো- মানুষের চোখে তখন মৃত্যু ছিল অনিবার্য। কিন্তু নবীর ঠোঁট থেকে উচ্চারিত হলো পূর্ণ তাওয়াক্কুলের সেই দোয়া- حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৭৩)
মুহূর্তেই আল্লাহর হুকুমে ভয়ংকর আগুন শান্ত ও শীতল হয়ে গেল। কোরআনে আল্লাহ বলেন- قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ ‘আমরা বললাম- হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া: ৬৯)
অলৌকিকভাবে ইবরাহিম (আ.) আগুন থেকে নিরাপদে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু নমরুদের অহংকার ভাঙল না। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) হিজরত করলেন ইরাকের ব্যাবিলন থেকে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে। অন্যদিকে নমরুদ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি ক্ষুদ্র মশার আঘাতে লাঞ্ছনাকর মৃত্যুর স্বাদ পেল।
আরও পড়ুন: ইবরাহিম (আ.)-এর স্ত্রী সারার চমকপ্রদ ঘটনা
হাদিসে এই দোয়া পাঠের প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। নবী কারিম (স.)-এর সাহাবিরাও কঠিন বিপদের সময় এই দোয়া পড়তেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় যখন দশ হাজার সেনা মদিনা অবরোধ করেছিল, তখন সাহাবিরা এই দোয়া পড়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছিলেন।
(বুখারি: ৪৫৬৩-৪৫৬৪; তিরমিজি: ২৪৩১)
আজও জীবনের ভয়, চাপ, ও সংকটে এই দোয়াই মুমিনের অন্তরে আশার প্রদীপ জ্বালায়- ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।’
আরও পড়ুন: ১০০ বছর পর জীবিত হয়েছিলেন যে নবী
এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়—
ইবরাহিম (আ.)-এর এই দোয়া কেবল ইতিহাস নয়; এটি ঈমানের শক্তিশালী বার্তা। আগুন তাঁর দেহকে স্পর্শ করতে পারেনি, কারণ আল্লাহর হুকুমেই আগুনের প্রকৃতি বদলে গিয়েছিল। ঠিক তেমনি, মুমিনের জীবনের প্রতিটি সংকটে যদি থাকে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও দোয়া তাহলে আল্লাহর সাহায্যও আসবেই।