ধর্ম ডেস্ক
০৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০৫ পিএম
একজন মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আল্লাহর ওপর দৃঢ় ঈমান আনা এবং জীবনের সকল বাঁধা-বিপত্তিতে সেই ঈমানকে অটুট রাখা। যারা তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তা নিয়ে কোনো সন্দেহ পোষণ না করে জীবন-সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই প্রকৃত সত্যনিষ্ঠ মুমিন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, অতঃপর তাতে কোনো ধরনের সন্দেহ পোষণ করেনি এবং তাদের জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। প্রকৃতপক্ষে তারাই হলো সত্যনিষ্ঠ।’ (সুরা হুজরাত: ১৫)
যারা এভাবে ঈমানের ওপর অবিচল থাকে, তারাই হলো নেককার বান্দা। তাদের জন্য রয়েছে মহাসুসংবাদ; মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তে ফেরেশতাদের সুন্দরবেশে আগমন ও সান্ত্বনা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের জন্য ফেরেশতাদের সান্ত্বনাবাণী বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’, তারপর তাতে অবিচল থাকে, তাদের নিকট ফেরেশতারা অবতরণ করে (এবং বলে), ‘তোমরা ভয় করো না ও দুঃখ করো না; এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। দুনিয়া ও আখেরাতে আমরাই তোমাদের বন্ধু। আর সেখানে (অর্থাৎ জান্নাতে) তোমাদের জন্য তোমাদের মন যা চায় তা-ই আছে; তোমরা যে জিনিসের আকাঙ্ক্ষা কর, তোমাদের জন্য সেখানে তা-ই আছে পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়নস্বরূপ।’ (সুরা হা মিম সাজদাহ: ৩০-৩২)
এই আয়াত দ্বারা স্পষ্ট যে, ফেরেশতাগণ মুমিনকে ভয়মুক্তির ঘোষণা দেন, জান্নাতের সুসংবাদ শোনান এবং নিজেদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে তার বন্ধু ও সাহায্যকারী হিসেবে পরিচয় দেন।
আরও পড়ুন: যার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা একসঙ্গে দোয়া করেন
১. উজ্জ্বল চেহারার ফেরেশতাদের আগমন: নেককার বান্দার যখন দুনিয়া থেকে বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন উজ্জ্বল শুভ্র চেহারার ফেরেশতারা তাঁর কাছে নেমে আসেন। তাদের চেহারাগুলো যেন একেকটি সূর্য। তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা হয় জান্নাতি কাফন ও জান্নাতি সুগন্ধি। তারা তাঁর কাছে বসে পড়েন।
২. সম্মানের সঙ্গে প্রাণ হরণ: এরপর মৃত্যুর ফেরেশতা (আজরাইল আ.) এসে তাঁর মাথার পাশে বসে বলেন, ‘হে পবিত্র আত্মা! আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো।’ রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তারপর পাত্রের মুখ থেকে গড়িয়ে পড়া ফোঁটার মতো তাঁর আত্মা বেরিয়ে আসে। আজরাইল (আ.) সেই আত্মাকে বরণ করে নেন।’ আজরাইল (আ.)-এর হাতে নেওয়ামাত্র চোখের পলকে অন্য ফেরেশতারা সেই আত্মা নিয়ে জান্নাতি কাফনে ও জান্নাতি সুগন্ধিতে রেখে দেন। তখন তার দেহ থেকে মেশকের চেয়েও উত্তম সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে।
৩. আসমানসমূহে সম্মানিত ভ্রমণ: ফেরেশতারা সেই আত্মাকে নিয়ে ঊর্ধ্বারোহণ করতে থাকেন। প্রতিটি আসমান অতিক্রমকালে ফেরেশতারা জিজ্ঞেস করেন, ‘এটা কার পবিত্র আত্মা?’ তারা তাঁর নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘অমুকের ছেলে অমুক।’ এভাবে তারা সপ্তম আসমান পর্যন্ত পৌঁছেন এবং প্রতিটি আসমানের ফেরেশতারা পরবর্তী আসমান পর্যন্ত তাঁর অনুসরণ করে বিদায় জানান।
আরও পড়ুন: ভালো মৃত্যুর নিদর্শনগুলো জেনে নিন
৪. আল্লাহর নির্দেশ ও দেহে রুহ ফেরত: সপ্তম আসমানে পৌঁছালে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দার আমলনামা ‘ইল্লিয়্যিনে’ রেখে দাও এবং তাকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে নাও। নিশ্চয়ই আমি তাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তাতেই ফিরিয়ে দেব এবং তার থেকে দ্বিতীয়বার বের করে আনব।’ রাসুল (স.) বলেন, ‘তারপর তাঁর রুহ তাঁর দেহে ফিরিয়ে আনা হয়।’
দেহে রুহ ফিরে আসার পর তাঁর কাছে দুজন ফেরেশতা (মুনকার ও নাকির) আসেন। তাঁরা তাঁকে বসান এবং জিজ্ঞেস করেন- ‘তোমার রব কে?’ তিনি বলেন, ‘আমার রব আল্লাহ।’ ‘তোমার ধর্ম কী?’ তিনি বলেন, ‘আমার ধর্ম ইসলাম।’ ‘তোমাদের কাছে পাঠানো এই লোকটি কে?’ তিনি বলেন, ‘তিনি আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ (স.)।’ ‘তোমার জ্ঞানের উৎস কী?’ তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, তার ওপর ঈমান এনেছি এবং তা সত্যায়ন করেছি।’
এতে ঘোষণা আসে, ‘আমার বান্দা সত্য বলেছে। তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও। জান্নাতের দিকে তার জন্য একটি দরজা খুলে দাও।’
আরও পড়ুন: মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের ডাক 'হে প্রশান্ত আত্মা', শুনুন পুরো গল্প
এ ধরনের মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যু লাভের জন্য প্রয়োজন জীবদ্দশায়ই ঈমান ও আমলকে সুন্দর করা। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার মঙ্গল চাইলে তাকে যোগ্য করে তোলেন।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কিসের যোগ্য?’ রাসুল (স.) বলেন, ‘মৃত্যুর আগে বেশি বেশি নেক আমল করার তাওফিক দিয়ে ওই ব্যক্তিকে আল্লাহ জান্নাতের যোগ্য করে তোলেন।’ (তিরমিজি: ২১৪২)
অতএব, আসুন আমরা আমাদের ঈমানকে পরিশুদ্ধ করি এবং নেক আমলের মাধ্যমে এমনই মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর জন্য নিজেদেকে প্রস্তুত করি, যেখানে ফেরেশতাদের সান্ত্বনা ও আল্লাহর ক্ষমা আমাদেরকে পরিবেষ্টিত করবে।
সূত্র: সুরা হুজরাত; মুসনাদ আহমদ; সুনানে নাসায়ি; সুনান তিরমিজি; তাফসির ইবনে কাসির