ধর্ম ডেস্ক
০৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:০৬ পিএম
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নামলে বর্ণিত হয়েছে ইয়েমেনের সাবা সাম্রাজ্যের রাণী বিলকিস ও আল্লাহর নবী সুলাইমান (আ.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি ক্ষমতা, অহংকার ও শেষ পর্যন্ত সত্যের সামনে আত্মসমর্পণের এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত।
নবী সুলাইমান (আ.) ছিলেন একই সঙ্গে নবী এবং কর্তৃত্বশীল একজন শাসক। জ্বিন, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীরও শাসক ছিলেন তিনি। একদিন সেনাবাহিনী পরিদর্শনকালে বা কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় হুদহুদ পাখির অনুপস্থিতি তাঁর নজর কাড়ে। উপযুক্ত কারণ দর্শাতে না পারলে তিনি পাখিটিকে শাস্তি দেয়ার মনস্থির করেন। কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ ফিরে এসে একটি গুপ্ত সংবাদ দেয় যে, ‘আমি আপনার অজানা একটি বিষয় আবিষ্কার করেছি এবং সাবা থেকে আপনার জন্য নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি দেখলাম- এক মহিলা সাবাবাসীদের ওপর রাজত্ব করছে; তাকে দেয়া হয়েছে সবকিছু আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। (সুরা নামল: ২২-২৪)
এই খবর শুনে সুলাইমান (আ.) হুদহুদের মাধ্যমে রাণী বিলকিসের কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন, যার ভাষা কোরআনে সংরক্ষিত আছে- ‘নিশ্চয় এটি সুলাইমানের পক্ষ থেকে এবং পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে। আমার বিরুদ্ধে উদ্ধত হয়ো না এবং অনুগত হয়ে আমার কাছে হাজির হও।’ (সুরা নামল: ৩০-৩১)
আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর শক্তির গোপন সূত্র: এক বিস্ময়কর দোয়া
রাণী বিলকিস পত্র পেয়ে মন্ত্রিপরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। মন্ত্রীরা বললেন- আমাদের শক্তি সামর্থ্য (যুদ্ধ করার মতো) রয়েছে কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা একান্তই আপনার। রাণী কূটনৈতিক পথ বেছে নেন। সভাসদকে বললেন- ‘আমি তাঁর কাছে উপঢৌকন পাঠাচ্ছি, তারপর দেখি, দূতেরা কী (জবাব) নিয়ে আসে।’ (সুরা নামল: ৩৫) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তিনি সুলাইমান (আ.)-এর কাছে মূল্যবান উপহারসামগ্রী প্রেরণ করেন। কিন্তু নবী সুলাইমান (আ.) সেই উপহার প্রত্যাখ্যান করে বললেন- ‘তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমরা যা দিয়েছ তার চেয়ে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপহার নিয়ে উল্লসিত হও।’ (সুরা নামল: ৩৬)
এরপর তাদেরকে সাফ জানিয়ে দিলেন অনুগত হয়ে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া সমাধান নেই; অন্যথায় বড় ক্ষতি অপেক্ষা করছে। পবিত্র কোরআনের ভাষায়- ‘তাদের কাছে ফিরে যাও, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে এক সেনাবাহিনী নিয়ে আসব যার মোকাবিলা করার শক্তি তাদের নেই, আমি অবশ্যই তাদেরকে অপমানিত করে সেখানে থেকে বের করে দেব আর তারা হবে অপদস্থ।’ (সুরা নামল: ৩৭)
এরপর সুলাইমান (আ.) নিজের সভাসদকে উদ্দেশ্য করে বলেন- ‘তারা আমার কাছে আত্মসমর্পণ করে আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার (রাণীর) সিংহাসন আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে?’ (সুরা নামল: ৩৮)
এক শক্তিশালী জ্বিন বলল, আমি এনে দেব আপনি সভা থেকে উঠার আগেই। কিন্তু যার ছিল কিতাবের ইলম (আসিফ ইবনে বরখিয়া), তিনি বললেন- ‘আমি আপনার কাছে তা চোখের পলক ফেলতেই এনে দেব।’ (সুরা নামল: ৪০)
অতঃপর নিয়ে আসা হয় রাণীর সিংহাসন এবং তা সুলাইমান (আ.)-এর দরবারে রাখা হয়। সুলাইমান (আ.) শুকরিয়া প্রকাশ করে বললেন- ‘এটি আমার রবের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন আমি কৃতজ্ঞ হই, না অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা নামল: ৪০)
আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর কি জাদুর আংটি ছিল?
রাণী বিলকিস যখন সুলাইমান (আ.)-এর দরবারে উপস্থিত হন, তখন তাঁকে তাঁর সিংহাসন চিনতে বলা হয়। রাণী বলল- ‘এটি যেন সেটিই’। (সুরা নামল: ৪২)
এরপর তাঁকে একটি স্বচ্ছ কাঁচের প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে বলা হল- ‘প্রাসাদে প্রবেশ কর।’ যখন সে তা দেখল, সে ওটাকে পানির হ্রদ মনে করল এবং সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেলল। সুলাইমান বললেন- ‘এটা তো স্বচ্ছ কাঁচমন্ডিত প্রাসাদ। সে নারী বলল- হে আমার প্রতিপালক! আমি অবশ্যই নিজের প্রতি জুলুম করেছি আর আমি সুলাইমানের সঙ্গে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করছি।’ (সুরা নামল: ৪৪)
এই ঘটনা শুধু একটি অলৌকিক কাহিনি নয়, বরং এর মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর জীবনবোধ ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা:
অহংকারের পরিণতি: রাণী বিলকিসের প্রাথমিক অবস্থা ছিল শিরক ও অহংকারে ভরা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সত্যের সামনে নত হন।
ইলমের মর্যাদা: আসিফ ইবনে বরখিয়ার ইলমে কিতাব তাঁকে কারামত প্রদর্শনে সাহায্য করেছিল। তবে কোনো কোনো তাফসিরবিদ এখানে ‘কিতাবের ইলমধারী’ বলতে ফেরেশতা অথবা স্বয়ং নবী সুলাইমানকেই বুঝিয়েছেন।
আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর হেকমতপূর্ণ বিচার: ইতিহাসের দুই অমর দৃষ্টান্ত
আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি ঈমান: সুলাইমান (আ.)-এর সকল ক্ষমতা ছিল আল্লাহর দান। তিনি বলতেন, ‘হে মানুষ! আমাদেরকে পাখির ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সব কিছু দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এটি হলো স্পষ্ট অনুগ্রহ।’ (সুরা নামল: ১৬)
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সুলাইমান (আ.) বলেছিলেন, 'আজ রাতে আমি একশত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করব, যাতে প্রত্যেকেই একজন করে যোদ্ধা জন্ম দেবে, যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে।' কিন্তু তিনি ভুলে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলেননি। ফলে মাত্র একজন নারী অপূর্ণাঙ্গ সন্তান জন্ম দেয়।’ (সহিহ বুখারি: ৫২৪২)
এই হাদিসটি শিক্ষা দেয় যে ভবিষ্যতের সকল কাজে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ।
রাণী বিলকিসের গল্প শাশ্বত সত্যের প্রতীক- ‘সত্যের সামনে আত্মসমর্পণই হলো প্রকৃত বিজয়।’ এই কাহিনি আজও আমাদের শেখায়-
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো ইসলাম।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯)