ধর্ম ডেস্ক
২০ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:০২ পিএম
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে এবং কিছু অদক্ষ বক্তার মাধ্যমে ‘জান্নাতে ভাই-বোনের দেখা হবে না’- এমন একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে জান্নাত হলো পূর্ণ সুখ ও শান্তির আবাস। সেখানে বিচ্ছেদ নয়, বরং ঈমানদার আত্মীয়দের মিলনই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি।
কোরআন ও সহিহ হাদিসের প্রমাণে স্পষ্টভাবে বলা যায়, ‘জান্নাতে ঈমানদার ভাই-বোনদের সঙ্গে দেখা হবে এবং তারা একত্রে বসবাস করবে।’
‘জান্নাতে ভাই-বোনের দেখা হবে না’- এই কথার কোনো ভিত্তি কোরআন বা সহিহ হাদিসে নেই। বরং আল্লাহ তাআলা বহু স্থানে জান্নাতে পরিবার-পরিজনের মিলনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা ঈমান আনে, আর তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, আমরা তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে।’ (সুরা তুর: ২১)
এই আয়াতে রয়েছে, জান্নাতে সন্তানদের সঙ্গে পিতা-মাতার মিলনের স্পষ্ট ঘোষণা। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহ ঈমানদার ব্যক্তির সন্তানদের মর্যাদা উন্নীত করবেন যেন পরিবার একসাথে থাকতে পারে। আবু মিজলিজ (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ জানেন যে, মুমিন ব্যক্তি দুনিয়ায় যেমন তার পরিবারকে একত্রে রাখতে ভালোবাসে, তেমনি আখেরাতেও তাদের একত্র করতে চান।’ (আদ-দুররুল মানসুর)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তারাও। আর ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে।’ (সুরা রাদ: ২৩)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ) বলেন, ‘আল্লাহ মুমিনদের তাদের প্রিয়জনদের পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তানদের সঙ্গে একত্র করবেন, যাতে তাদের চোখ শীতল হয়। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, নিচের স্তরের ব্যক্তিকে উপরের স্তরের মর্যাদায় উন্নীত করা হবে, কারো মর্যাদা কমানো ছাড়াই। আয়াতে ব্যবহৃত ‘আবাআউহুম’ (পিতা-মাতা) ও ‘যুররিয়্যাতুহুম’ (সন্তান-সন্ততি) শব্দগুলোর অন্তর্ভুক্ত অর্থে ভাই-বোনও আসে।
আরও পড়ুন: জান্নাতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকার আমল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর আমরা তাদের অন্তর হতে বিদ্বেষ দূর করব; তারা ভাইয়ের মত পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে’। (সুরা হিজর: ৪৭) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাদিসে এসেছে, وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَىٰ سُرُرٍ مُّتَقَابِلِينَ অর্থাৎ ‘আমি তাদের বুক থেকে সকল হিংসা-বিদ্বেষ তুলে নেব। তারা ভাই-ভাই হয়ে সিংহাসনে পরস্পর মুখোমুখি বসবে।’
এখানে ‘ইখওয়ানান’ শব্দটি বাস্তব ও রূপক দুই অর্থেই ব্যবহৃত। ভাই-বোনদের পারস্পরিক ভালোবাসা বোঝাতেও। ইবনে কাসির (রহ) বলেন, এটি জান্নাতে আত্মীয়তার সম্পর্ক ও পারস্পরিক ভালোবাসার প্রতীক।
এ ছাড়াও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (স.) বলেছেন- المَرْءُ مع مَن أحَبَّ ‘(আখিরাতে) মানুষ থাকবে তার প্রিয়জনদের সঙ্গে।’ (বুখারি: ৬১৭০; মুসলিম: ২৬৩৯ তিরমিজি: ২৩৮৭) এ হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, দুনিয়াতে যে যাকে ভালোবাসতো কেয়ামতের দিন সে তার সাথে অবস্থান করবে। ভাই-বোনও এর অন্তর্ভূক্ত।
যদি উভয়ই মুমিন হয়, তারা জান্নাতে অবশ্যই মিলিত হবে। সম্পর্ক আরও সুন্দর ও নির্মল হবে, কোনো হিংসা-ঝগড়া ছাড়াই। তারা একসঙ্গে বসবাস করবে ও আনন্দঘন আলাপচারিতা করবে।
যদি একজন জান্নাতে, অন্যজন জাহান্নামে যায়, তখন দেখা নাও হতে পারে। তবে সুরা আস-সাফফাতে বলা হয়েছে, জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের মধ্যে মাঝে মাঝে কথোপকথনও হবে, যা জান্নাতিদের আনন্দ এবং জাহান্নামিদের বেদনা বাড়াবে।
আরও পড়ুন: দুইবার বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর কাছে থাকবে?
হাশরের ময়দানে সবাই পরস্পরকে চিনতে পারলেও সেদিন প্রত্যেকেই নিজ নিজ হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। কোনো ব্যক্তি অন্যজনের পাপের বোঝা বহন করবে নাভ যেমন আল্লাহ বলেন- وَلاَ تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ‘কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা ফাতির: ১৮)
জান্নাত পূর্ণতার স্থান: ‘এখানে তারা যা কামনা করবে তা-ই থাকবে এবং আমার কাছে রয়েছে তারও বেশি।’ (সুরা কাফ: ৩৫)
পারিবারিক বন্ধন জান্নাতেও স্থায়ী: দুনিয়ার পবিত্র সম্পর্কগুলো জান্নাতে আরও পবিত্র রূপে টিকে থাকবে। ভাই-বোনের হালাল ভালোবাসা সেখানে আরও বৃদ্ধি পাবে। নবীজি বলেছেন, ‘তাদের অন্তরগুলো এক ব্যক্তির অন্তরের মতো থাকবে। তাদের মধ্যে কোনো রকম মতভেদ থাকবে না আর পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৩২৪৬)
আরও পড়ুন: জান্নাতি হুরদের ৮ বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য
আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতা: মুমিনের দোয়ার বরকতে আল্লাহ তার আত্মীয়দের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, যেন তারা একত্রে বসবাস করতে পারে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, জান্নাতি ব্যাক্তি জান্নাতে প্ৰবেশ করে তার পিতামাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে যে, তারা কোথায় আছে? জবাবে বলা হবে যে, তারা তোমার মর্তবা পর্যন্ত পৌছতে পারেনি। তাই তারা জান্নাতে আলাদা জায়গায় আছে। এই ব্যক্তি আরজ করবে, হে রব! দুনিয়াতে নিজের জন্যে ও তাদের সবার জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আদেশ হবে, তাদেরকেও জান্নাতের এই স্তরে একসাথে রাখা হোক। (তাফসির, সুরা তুর: ২১)
উৎস: কিছু বক্তা বৈবাহিক সম্পর্ককে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে রক্তের সম্পর্ককে গৌণ মনে করেন, যা কোরআন-সুন্নাহবিরোধী।
খণ্ডন: ইসলামে রক্তের সম্পর্ক (সিলাতুর রহিম) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব করেন।’ (সহিহ বুখারি)
‘জান্নাতে ভাই-বোনের দেখা হবে না’—এই দাবি কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং ঈমানদার ভাই-বোনরা জান্নাতে একে অপরের সান্নিধ্য লাভ করবে। পারিবারিক বন্ধন জান্নাতে আরও সুদৃঢ় ও পবিত্র রূপ পাবে। আল্লাহর রহমতে নিম্ন মর্যাদার আত্মীয়দের উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করা হবে।
হে আল্লাহ! আমাদেরকে ও আমাদের প্রিয়জনদেরকে জান্নাতে একত্রিত করুন। আমিন ইয়া রাব্বাল আলামিন।