images

ইসলাম

মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের ডাক ‘হে প্রশান্ত আত্মা’, শুনুন পুরো গল্প

ধর্ম ডেস্ক

১৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৪৪ পিএম

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ফাজরের ২৭-৩০ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক চূড়ান্ত সাফল্যের সংবাদ দিয়েছেন, যা প্রতিটি ঈমানদারের হৃদয়কে আলোড়িত করে। ‘হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে এসো তোমার রবের দিকে, সন্তুষ্টচিত্তে ও সন্তোষভাজন হয়ে; প্রবেশ করো আমার বান্দাদের মাঝে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।’ (সুরা আল-ফাজর: ২৭-৩০)

এই আয়াত এক বিশ্বাসী আত্মার পরম গন্তব্যের ঘোষণা, যা জান্নাতের চূড়ান্ত সফলতার বার্তা।

প্রশান্ত আত্মার পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

এটি সেই উন্নত স্তরের নফস, যা মন্দ প্রবণতা থেকে মুক্ত হয়ে পুরোপুরি আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হয়। এই নফস আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জন করে। এই নফসের অধিকারী দুঃখে-কষ্টে, সুখে-সাচ্ছন্দ্যে—সব অবস্থায় আল্লাহমুখী থাকে। আল্লাহর নির্ধারণে সন্তুষ্ট থাকে।

 ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘বান্দা যখন আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে, তখনই বোঝা যায় আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট।’ এই আত্মা জিকির, ইবাদত ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আল্লাহর বিধান মেনে জীবনযাপন করে।

আরও পড়ুন: নফসকে নিয়ন্ত্রণের ৪ দোয়া

মৃত্যুর সময় প্রশান্ত আত্মার অবস্থা

হাদিসে বর্ণিত, ‘যখন মুমিনের মৃত্যুর সময় আসে, তখন রহমতের ফেরেশতারা সাদা রেশমি কাপড় নিয়ে এসে বলেন- ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট অবস্থায় বের হয়ে এসো; তোমার জন্য আছে জান্নাতের সুসংবাদ।’ (মুসনাদে আহমদ, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ)

রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তিকে মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সংবাদ দেন, যা শুনে মৃত্যু তার কাছে প্রিয় হয়ে যায়।’ (তাফসিরে মাজহারি)

প্রকৃত বাসস্থানের প্রত্যাবর্তন

আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি ফিরে এসো তোমার রবের দিকে।’ এখানে ‘ফিরে আসা’ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে, আত্মার আসল ঠিকানাই তার রবের সান্নিধ্য। তাফসিরে এসেছে, ‘মুমিনের আত্মা মৃত্যুর পর ইল্লিয়্যিনে অবস্থান করে, যা আরশের ছায়াতলে অবস্থিত জান্নাতি স্থান।’ (তাফসির ইবন কাসির)

অর্থাৎ আত্মা দুনিয়াতে অস্থায়ীভাবে প্রেরিত, আবার ফিরে যাবে তার প্রকৃত নিবাসে—আল্লাহর কাছে।

আরও পড়ুন: গুনাহগার বান্দা যেভাবে ডাকলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন

জান্নাতের আহ্বানের তিন ধাপ

তাফসিরবিদদের ভিন্ন ভিন্ন মতে, পবিত্র আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রশান্ত আত্মাকে তিন ধাপে আহ্বান করেছেন।

১. ‘ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি সন্তুষ্টচিত্তে, সন্তোষভাজন হয়ে।’ এটি মৃত্যুর সময় বা কেয়ামতের দিনে পুনরুত্থানের মুহূর্তে বলা হবে।

২. ‘আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও।’ এটি বিশেষ সম্মান। ওই নফসের অধিকারীদের এটি বলা হবে। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘হে আবু বকর! মৃত্যুর পর ফেরেশতারা আপনাকে এভাবেই সম্বোধন করবেন।’ (ইবন কাসির, তাফসির)

৩. ‘প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।’ এটি চূড়ান্ত পুরস্কার ও আল্লাহর নৈকট্যের প্রতিফল।

প্রশান্ত আত্মা হওয়ার পথ: নফসে মুতমাইন্নাহর চার বৈশিষ্ট্য

১. অন্তরে ও বাইরে নেক হয়। বাহ্যিক আচরণ ও অন্তরের বিশ্বাসের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব বা অসঙ্গতি না থাকা।

২. আল্লাহর ফয়সালা ও নির্ধারণে সন্তুষ্ট। তারা বিপদে ভেঙে পড়ে না, হা-হুতাশ করে না, বরং ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর তাআলার সাহায্য প্রার্থনা করে।

৩. অহংকারমুক্ত ও বিনয়ী। সে নিজেকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও উন্নত মনে করে না। কোনো নেক আমল করার সুযোগ পেলে এটাকে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ মনে করে।

৪. অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায় না। পরচর্চা ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকে। নিজের কী ত্রুটি আছে তা খোঁজার চেষ্টা করে এবং নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করে।

যখন বান্দা এ উপলব্ধিতে পৌঁছে যায়, সব কিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, তখন তার অন্তরে নেমে আসে চূড়ান্ত প্রশান্তি।

‘হে প্রশান্ত আত্মা!’ এই আহ্বান প্রকৃত সাফল্যের প্রতীক। এই ডাক পেতে হলে আমাদের দুনিয়ার জীবনেই হতে হবে আল্লাহর বিধানে সন্তুষ্ট, সৎকর্মপরায়ণ ও পরহেজগার। যে আত্মা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট থাকে, তাকেই আল্লাহ আহ্বান করবেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের দলে এবং জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেবেন। সেই জান্নাতেই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা, চূড়ান্ত মুক্তি এবং অনন্ত প্রশান্তি।