images

ইসলাম

কূপে নিঃসঙ্গ ইউসুফ (আ.): জিব্রাইলের যে বার্তা বদলে দিল সবকিছু

ধর্ম ডেস্ক

০৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:০৭ পিএম

ইসলামের ইতিহাসে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনচরিত এক অনন্য ও শিক্ষণীয় অধ্যায়। তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা মুমিনদের জন্য ধৈর্য, ঈমান, সততা ও তাওয়াক্কুলের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে যখন ভাইদের ষড়যন্ত্রে তিনি কূপে নিক্ষিপ্ত হলেন, তখন তাঁর নিঃসঙ্গতা ও অসহায় অবস্থায় আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সান্ত্বনা ও আশার বার্তা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর তারা তাকে নিয়ে গেল এবং সম্মিলিতভাবে পরামর্শ করে তাকে কূপের গভীরে নিক্ষেপ করল। আর আমি তার কাছে ওহি পাঠালাম— ‘অবশ্যই তুমি তাদেরকে তাদের এই কাজের কথা একদিন বলবে, অথচ তারা তা বুঝতে পারবে না।’ (সুরা ইউসুফ: ১৫)

ওহির গভীর মর্ম ও তাৎপর্য

তাফসির ইবনে কাসির, কুরতুবি ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ তাফসির গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন ইউসুফ (আ.) কূপে নিক্ষিপ্ত হন, তখন ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা ও আশার বার্তা পৌঁছে দেন। যা পরবর্তীতে ইউসুফ (আ.)-এর অন্তরের দৃঢ়তা ও ঈমানের অটুট উৎস হিসেবে কাজ করে এবং পরবর্তী সকল পরীক্ষায় অটল ও সাহসী করে তোলে। অবশ্য তাফসিরবিদদের অনেকে বলেছেন, এই প্রত্যাদেশ ছিল কূপে নিক্ষিপ্ত হবার আগমুহূর্তের। যা তাকে দৃঢ় রেখেছিল।

তাফসিরে ইবনে কাসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে কূপে ওহি দান করেন যে একদিন তিনি এই অন্যায়ের পরিণতি চমৎকারভাবে প্রকাশ করবেন। এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ প্রতিশ্রুতি।

আরও পড়ুন: হজরত মুসা ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পটভূমি

ইউসুফ (আ.) ছিলেন হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর প্রিয় পুত্র এবং হজরত ইসহাক (আ.)-এর বংশধর। তাঁর ভাইয়েরা পিতার অতিরিক্ত স্নেহে ঈর্ষান্বিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে কূপে নিক্ষেপ করে। পরবর্তীতে একটি কাফেলা তাঁকে উদ্ধার করে মিসরে নিয়ে যায় এবং দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু এই কূপের পরীক্ষা ছিল আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনার অংশ।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন- ‘আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আ.)-কে কূপের পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তী শাসনক্ষমতার যোগ্য করে গড়ে তোলেন।’ (তাফসিরে তাবারি)

এক ব্যবসায়িক দল কূপ থেকে তাঁকে তুলে মিসরে গিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিলো। ‘আর মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, “এর থাকার সুন্দর সম্মানজনক ব্যবস্থা করো। আশা করা যায়, সে আমাদের উপকার করবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করব”।’ (সুরা ইউসুফ: ২১)

ওহির তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

কূপের অন্ধকারে প্রাপ্ত আল্লাহর বিশেষ অনুপ্রেরণা ইউসুফ (আ.)-এর অন্তরে অটল ঈমানের বীজ রোপণ করেছিল। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে যখন তিনি মিথ্যা অপবাদে কারাবরণ করলেন, তখনও এই বিশ্বাস তাঁকে ধৈর্যশীল রেখেছিল। ইউসুফ (আ.)-এর সেই অটল বিশ্বাসের প্রকাশ আমরা দেখি তাঁর এই বক্তব্যে- ‘আমি জেলখানাকে পছন্দ করি, তাদের (নারীদের) আহ্বানের চেয়ে।’ (সুরা ইউসুফ: ৩৩)

এই দৃঢ়তা ও আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুলই পরবর্তীতে তাঁকে মিশরের অর্থমন্ত্রী ও শাসনকর্তার উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পদে উন্নীত করে।

আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর শক্তির গোপন সূত্র: এক বিস্ময়কর দোয়া

চিরন্তন শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

ইউসুফ (আ.)-এর এই ঘটনা থেকে আমরা যে মূল্যবান শিক্ষা লাভ করি

আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা: সবচেয়ে কঠিন ও অন্ধকার পরিস্থিতিতেও আল্লাহ মুমিনের পাশে থাকেন এবং তাঁকে সাহায্য করেন।

ধৈর্য ও ঈমানের ফলমূলক দিক: পরীক্ষা মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। যেমন ইউসুফ (আ.) কূপের অন্ধকার থেকে রাজদরবারের আলোকে পৌঁছেছিলেন।

আল্লাহর পরিকল্পনার মহিমা: মানুষ ক্ষণস্থায়ী ঘটনায় বিচলিত হয়, কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা সর্বদা কল্যাণকর ও বিজ্ঞানময়।

ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত: পরবর্তীতে ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের বলেছিলেন-‘আজ তোমাদের জন্য কোনো ভর্ৎসনা নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।’ (সুরা ইউসুফ: ৯২)

আরও পড়ুন: ফেরাউনের ডুবে মরার ঐতিহাসিক মুহূর্ত: কোরআন ও হাদিসের আলোকে

ওহির বাস্তবায়ন: কূপবাসী থেকে মিশরের শাসক

জিব্রাইল (আ.)-এর দেওয়া বার্তা সত্যি হলো, যখন ইউসুফ (আ.) মিসরে মর্যাদাপূর্ণ পদে উন্নীত হলেন। রাজা তাঁকে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিলেন। বললেন- ‘আজ আপনি আমাদের কাছে খুবই মর্যাদাশীল ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিগণিত।’ (সুরা ইউসুফ: ৫৪) দুর্ভিক্ষের সময় দেশের ভাণ্ডারগারের দায়িত্ব নিয়ে আল্লাহর ইচ্ছায় মহাসংকট উত্তরণ করেছিলেন। রাজাকে তিনি বলেছিলেন- ‘আমাকে দেশের ধনভান্ডারের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন; আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ।’ (সুরা ইউসুফ: ৫৫)

তাফসিরে উল্লেখ আছে, ইউসুফ (আ.) শুধু অর্থমন্ত্রী নন, পুরো মিসরের প্রভাবশালী, মর্যাদাবান ও বিশ্বাস্ত শাসক ছিলেন (ইবনে কাসির)

চূড়ান্ত প্রতিফলন

হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কূপের ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক কাহিনি নয়; বরং এটি আল্লাহর রহমত, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের জীবন্ত শিক্ষাগ্রন্থ। জিব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত সেই আল্লাহপ্রদত্ত সুসংবাদই তাঁর জীবনের দিকনির্দেশনা হয়ে উঠেছিল। যে ব্যক্তি বিপদে আল্লাহর উপর নির্ভর করতে শেখে, আল্লাহ তাআলা তাকে একদিন সম্মান ও সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন। এই শিক্ষা আজও প্রতিটি মুমিনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য—আল্লাহর উপর ভরসা রাখা, ধৈর্য ধারণ করা এবং তাঁর পরিকল্পনার উপর বিশ্বাস রাখাই হলো প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি।