images

ইসলাম

যে অভিযান খালিদ বিন ওয়ালিদকে বানিয়েছিল ‘সাইফুল্লাহ’

ধর্ম ডেস্ক

০৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:০১ পিএম

ইসলামের ইতিহাসে অষ্টম হিজরিতে সংঘটিত মুতার যুদ্ধ ছিল মুসলিম বাহিনী ও রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্যের প্রথম সরাসরি সংঘর্ষ। এই যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর অসাধারণ সামরিক নেতৃত্ব ও কৌশলই তাঁকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পক্ষ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ (আল্লাহর তরবারি) উপাধি এনে দেয়।

যুদ্ধের পটভূমি

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রেরিত দূত হারেস ইবনে উমাইর (রা.)-কে গাসসানীয় শাসক হত্যা করলে মুসলিম রাষ্ট্রদূতের হত্যার প্রতিশোধে তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয়। বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)। তিনি শহীদ হলে ক্রমান্বয়ে নেতৃত্ব দেন জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)—তাঁরাও শাহাদাতবরণ করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নবাবিয়্যাহ)

খালিদের নেতৃত্ব গ্রহণ

তিনজন সেনাপতির শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন সাহাবিরা খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে- ‘এরপর আল্লাহর তরবারি (খালিদ) পতাকা গ্রহণ করলেন এবং আল্লাহ তাঁর হাত দিয়ে বিজয় দান করলেন।’ (সহিহ বুখারি: ৩৯৩৯)

আরও পড়ুন: পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত একমাত্র সাহাবি

খালিদের সামরিক কৌশল

মুতার যুদ্ধ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ রোমান সেনার বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর এক কঠিন পরীক্ষা। মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্যকে প্রায় দুই লক্ষ রোমান ও গাসসানীয় বাহিনীর মোকাবিলা করতে হয়েছিল। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) মুতার যুদ্ধে নিম্নলিখিত সামরিক কৌশলগুলো প্রয়োগ করেছিলেন:

১. সৈন্য বিন্যাস পরিবর্তন কৌশল
যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি দিনে একাধিকবার মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস পরিবর্তন করেন। এতে শত্রুর মনে হয় নতুন বাহিনী এসে মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ২, পৃ. ১৩৯)

আরও পড়ুন: খন্দক যুদ্ধে অলৌকিক আহার: এক হাজার সাহাবিকে খাওয়ালেন রাসুল (স.)

২. সংগঠিত পশ্চাদপসরণ
সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষে বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় খালিদ (রা.) পূর্ণাঙ্গ পশ্চাদপসরণ না করে ধাপে ধাপে সেনাদের সরিয়ে আনেন। এতে মুসলিম বাহিনী শৃঙ্খলা হারায়নি, আবার আতঙ্কও ছড়ায়নি। ইতিহাসবিদরা এটিকে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ‘সংগঠিত রণকৌশলগত পশ্চাদপসরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৯৬)

৩. রাতের আক্রমণ ও ধোঁকা কৌশল
রাতের আক্রমণ চালিয়ে তিনি শত্রুকে বিভ্রান্ত করেন এবং মুসলিম সৈন্যদের মনোবল দৃঢ় করেন। আবার দিনের বেলায় ধুলা উড়িয়ে এমন ভান সৃষ্টি করেন যে নতুন সাহায্য এসে পৌঁছেছে। এতে রোমান বাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪০১-৪০২)

৪. তরবারির সাহসিকতা
মুতার যুদ্ধে তিনজন সেনাপতির শাহাদাতের পর খালিদ (রা.) নেতৃত্ব দেন। তিনি এতটাই তীব্রভাবে যুদ্ধ করেন যে তাঁর হাতে নয়টি তরবারি ভেঙে যায়। শেষে ইয়েমেনি একটি তরবারি দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। (সহিহ বুখারি: ৩৯৩৯; ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ২, পৃ. ১৪২)

আরও পড়ুন: ইতিহাসের পাতায় সুউজ্জ্বল পাঁচ কিশোর সাহাবি

রাসুলের (স.) ঘোষণা

মদিনায় বসেই রাসুলুল্লাহ (স.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা জানতে পারেন। তিনি সাহাবাদের উদ্দেশে বলেন- ‘জায়েদ পতাকা নিলেন, তিনি শহীদ হলেন। পরে জাফর পতাকা নিলেন, তিনি শহীদ হলেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা নিলেন, তিনিও শহীদ হলেন। তারপর আল্লাহর তরবারি (খালিদ) পতাকা নিলেন, আল্লাহ তাঁকে বিজয় দান করলেন।’ (সহিহ বুখারি: ৩৯৩৬)

এরপর থেকেই খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর উপাধি হয় 'সাইফুল্লাহ'

মুতার যুদ্ধ প্রমাণ করে যে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ছিলেন অসাধারণ সামরিক কৌশলী ও শ্রেষ্ঠ বীর। সংখ্যাগরিষ্ঠ শত্রুর মুখোমুখি হয়েও তাঁর নেতৃত্বে মুসলিমরা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যুদ্ধ চালায় এবং নিরাপদে ফিরে আসে। ইতিহাসবিদদের মতে, এ যুদ্ধেই তাঁর সামরিক প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে এবং নবী কারিম (স.) তাঁকে উপাধি দেন ‘সাইফুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর তরবারি’।