images

ইসলাম

ফেতনার ঢেউয়ে ঈমান বাঁচানোর পথ

ধর্ম ডেস্ক

০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:১৪ পিএম

ঈমান মুসলিম জীবনের সর্বোত্তম সম্পদ, যার ওপর নির্ভর করে সব আমলের গ্রহণযোগ্যতা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করে বলেছেন, ‘সময়ের কসম! নিশ্চয়ই সব মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। শুধু তারা ব্যতীত; যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে।’ (সুরা আসর: ১-২)

প্রত্যেক যুগে ঈমানের সংরক্ষণ জরুরি হলেও বর্তমান ফেতনার যুগে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাদিস অনুযায়ী, কেয়ামতের আগে ঈমান এতটাই দুর্বল হয়ে যাবে যে মানুষ সকালে মুমিন থাকবে, আর সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে। অথবা সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে, সকালে কাফের হয়ে যাবে। তারা নিজেদের দ্বীনকে সামান্য পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেবে।

ফেতনা ও ঈমান হারানোর কারণ

রাসুলুল্লাহ (স.) এই ফেতনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা অন্ধকার রাতের টুকরোগুলোর মতো (যা একটার পর একটা আসতে থাকে) ফেতনা আসার আগে নেকির কাজ দ্রুত করে ফেলো। মানুষ সেসময় সকালে মুমিন থাকবে এবং সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে অথবা সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে, সকালে কাফের হয়ে যাবে। নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার সম্পদের বিনিময়ে বিক্রি করবে।’ (মুসলিম: ১১৮)

এই হাদিস অনুযায়ী, কেয়ামতের আগে মানুষের মধ্যে কুফুরি বিশ্বাস ও কর্ম বেড়ে যাবে। দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলের জন্য মানুষ এতটাই বেপরোয়া হবে যে অর্থের বিনিময়ে ইসলামের বিরোধিতা করবে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে মন্দ কথা বলবে এবং কাফেরদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে। এমনকি অনেক আলেমও টাকা-পয়সার লোভে হারামকে হালাল বলে ফতোয়া দেবেন।

আরও পড়ুন: যেসব ফেতনার ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন নবীজি

হাদিস অনুযায়ী, অনেক মানুষ জানতেও পারবে না যে সে আর মুসলিম নেই, অথচ সে নিজেকে মুসলিম দাবি করবে। এই ধরনের মানুষ আমাদের চারপাশেই ঘুরবে, ফিরবে। তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে, যাকে তার রবের আয়াতসমূহ দিয়ে উপদেশ দেওয়া হয় অথচ সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? অবশ্যই আমি (আল্লাহ) অপরাধীদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী।’ (সুরা সাজদাহ: ২২)

বিভিন্ন কারণে মানুষ ঈমান হারাতে পারে, যেমন-

শিরক: আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা।

দ্বীনি বিধানকে অপছন্দ: রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আনিত কোনো বিধানকে অপছন্দ করা।

ঠাট্টা-বিদ্রূপ: দ্বীনের কোনো বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা।

ইসলামের বিরুদ্ধে সহযোগিতা: মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফের-মুশরিকদের সমর্থন ও সহযোগিতা করা। 
(দ্র: সুরা নিসা: ৪৮, ৬৫; সুরা সাজদাহ: ২২; সুরা তওবা: ৬৫-৬৬; সুরা বাকারা: ১০২; সুরা তাওবা: ২৩; সুরা নিসা: ১৪; সুরা নিসা: ৬০; সুরা মায়েদা: ৫১)

এই বিষয়গুলো বর্তমান যুগে ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। তাই ক্ষণে ক্ষণে নিজের ঈমানকে যাচাই ও সংরক্ষণ করা, প্রয়োজনে নবায়ন করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

আরও পড়ুন: কেয়ামতের আগে যেসব ঘটনা বেড়ে যাবে

ফিরে আসার পথ

এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের ঈমানের সংরক্ষণ করতে আমাদের ফিরে যেতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.)-এর দেখানো পথে। হাদিসে এসেছে, নবীজি (স.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কাছে দুই বস্তু রেখে যাচ্ছি। তোমরা যতক্ষণ তা ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ।’ (মুয়াত্তা মালিক: ১৬০৪)

এই ফেতনার সময়ে মুসলিমদের জামাতবদ্ধ থাকার জন্য রাসুল (স.) নির্দেশ দিয়েছেন। হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তোমরা মুসলিমদের জামাত ও ইমামের সঙ্গে আঁকড়ে থাকবে। আমি বললাম, যদি তাদের কোনো জামাত বা ইমাম না থাকে? তিনি বলেন, ‘তাহলে সেসব বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে তুমি আলাদা থাকবে, যদিও তুমি একটি বৃক্ষমূল দাঁত দিয়ে আঁকড়ে থাকো এবং এ অবস্থায়ই মৃত্যু তোমার নাগাল পায়।’ (মুসলিম: ৪৬৭৮)

অন্য হাদিসে রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে তাকাবে, ফিতনা তাকে ঘিরে ধরবে। তখন কেউ যদি কোনো আশ্রয়ের জায়গা কিংবা নিরাপদ জায়গা পায়, তাহলে সে যেন আত্মরক্ষা করে।’ (বুখারি: ৭০৮১) ফেতনার সময় ঈমানদারের আরেকটি বিশেষ করণীয় হলো- সর্বদা চুপ থাকা। এত পরিমাণ চুপ থাকা, যার কারণে কোনো ফিতনা তাকে আকৃষ্ট করতে না পারে। (আল ফিতান: ৭৩৫) 

এছাড়াও একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরের পরিবেশে বের না হওয়া জরুরি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, অচিরেই এমন ফিতনার আত্মপ্রকাশ হবে, বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি হতে উত্তম হবে। আর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি হতে উত্তম হবে। আর চলমান ব্যক্তি দ্রুতগামী ব্যক্তি হতে ভালো থাকবে। (মুসলিম: ৭১৩৯)

আরও পড়ুন: যে দোয়া পড়লে দুনিয়া-আখেরাতে আল্লাহই যথেষ্ট

দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

ফেতনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য রাসুল (স.) তাঁর উম্মতকে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিখিয়েছেন। সেগুলো হলো-

১. ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফিতানি, মা জহারা মিনহা ওয়া মা বাতানা।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল ফিতনা থেকে পরিত্রাণ চাই।’ (মুসনাদে আহমদ: ২৭৭৮)

২. ‘ইয়া মুকাল্লিবাল ক্বুলুব সাব্বিত ক্বালবি আলা দ্বীনিক।’ অর্থ: ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর অটল রাখো।’ (তিরমিজি: ৩৫২২)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই ফেতনার জামানায় বেঈমান ও মুরতাদের মিছিলে শামিল হওয়া থেকে হেফাজত করুন। মজবুত ঈমান নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।