images

ইসলাম

আহলে বাইতকে ভালোবাসা কেন কর্তব্য

ধর্ম ডেস্ক

২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৫৪ পিএম

ইসলামে কিছু সম্পর্ক রয়েছে যা সরাসরি ঈমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পবিত্র পরিবারের সদস্য বা আহলে বাইত এমনই এক সম্মানিত শ্রেণী, যাঁদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।

নবী কারিম (স.) বলেন- ‘আল্লাহর কসম! কোনো ব্যক্তির অন্তরে ঈমান প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে আমার আহলে বাইতকে ভালোবাসবে আল্লাহর জন্য এবং আমার আত্মীয়তার কারণে।’ (ইবনে মাজাহ: ১৪০)

এই হাদিস স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের একটি মৌলিক ভিত্তি। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসুলের প্রতি গভীর আনুগত্যের প্রকাশ।

কোরআনে আহলে বাইতের মর্যাদা

পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদা ফুটে উঠেছে।

১. ভালোবাসার আদেশ: ‘বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে আত্মীয়তার সৌহার্দ্য ছাড়া অন্য কোনো প্রতিদান চাই না।’ (সুরা শুরা: ২৩) আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, যখন এই আয়াত নাজিল হলো তখন সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কারা আপনার নিকটাত্মীয়? যাঁদের মুয়াদ্দাত (ভালোবাসা) পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে ফরজ করা হয়েছে।’ জবাবে নবীজি (স.) বলেন, ‘আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইনের মুয়াদ্দাত (ভালোবাসা)।’ (তাফসিরে মাজহারি: ১১/৬৩)

২. পবিত্রতার ঘোষণা: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে, হে আহলে বাইত!’ (সুরা আহজাব: ৩৩)

৩. মোবাহেলার ঘটনায় উপস্থিতি: ‘আসো, আমরা ডাকি আমাদের সন্তানদের ও তোমাদের সন্তানদের, আমাদের নারীদের ও তোমাদের নারীদের, এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের...’ (সুরা আলে ইমরান: ৬১) এই আয়াত নাজিলের পর রাসুল (স.) হজরত আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে সাথে নিয়ে মোবাহেলায় অংশ নেন, যা তাদের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ।

আরও পড়ুন: ছোট্ট যে আমল ভুলে যাওয়া মানে জান্নাতের পথ ভুলে যাওয়া

আহলে বায়ত কারা?

প্রধানত আহলে বায়ত বলতে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.), তাঁর জামাতা আলী (রা.) এবং তাদের সন্তান হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে বোঝায়। ‘হাদিসে কিসা’ বা চাদরের হাদিসে এদেরকে সুরা আহজাবের ৩৩ নং আয়াতের বিশেষ সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে (সহিহ মুসলিম: ২৪২৪)। ব্যাপক অর্থে নবীজির সকল স্ত্রীগণও (উম্মাহাতুল মুমিনিন) আহলে বায়তের মর্যাদার অংশ, যেমনটি অন্যান্য বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। (মুসনাদে তাহাবি, সিলসিলাহ সহিহাহ; তিরমিজি: ৩২০৫)

ভালোবাসার ধারাবাহিকতা: আল্লাহ → রাসূল → আহলে বাইত

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, কারণ তিনি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আল্লাহর জন্য আমাকে ভালোবাসো। আর আমার জন্য আমার পরিবারকে ভালোবাসো।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৭৮৯) এই হাদিস মুমিনের ভালোবাসার একটি সুস্পষ্ট স্তরবিন্যাস তুলে ধরে: প্রথমত আল্লাহ, এরপর তাঁর রাসুল এবং এরপর তাঁর পরিবার।

আহলে বাইতের বিশেষ অধিকার

কোরআন ও হাদিসে আহলে বাইতের জন্য কিছু বিশেষ বিধান রয়েছে:

১. ফাই ও গণিমতের অংশ: ‘আল্লাহ তাঁর রাসুলকে যে সম্পদ দিয়েছেন, তা আল্লাহ, রাসুল, তাঁর আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য...’ (সুরা হাশর: ৭)

২. জাকাত গ্রহণ নিষিদ্ধ: রাসুল (স.) বলেছেন- ‘আমার পরিবারের জন্য জাকাত হালাল নয়।’ (সহিহ মুসলিম)

আরও পড়ুন: সকাল- বিকেল ১০ বার দরুদ পড়লে যা পাবেন

ভালোবাসায় সীমালঙ্ঘন নয়

আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। রাসুল (স.) সতর্ক করে দিয়েছেন- ‘ইহুদিরা ঈসা ইবনে মরিয়মকে অতিরিক্ত সম্মান দেখিয়ে তাঁকে আল্লাহ বানিয়ে ফেলেছিল। তোমরা আমার ব্যাপারে সেরকম করো না। আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪৪২)

ইতিহাস থেকে শিক্ষা: সম্মানের দৃষ্টান্ত

ইসলামের ইতিহাসে আহলে বাইতের প্রতি সাহাবিদের সীমাহীন সম্মানের অসংখ্য দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। যেমন, ইমাম মালিক (রহ.) যখন খলিফার নির্দেশে কঠিন নির্যাতনের শিকার হন, তখন তিনি বলেন- ‘আমি এই জুলুম ক্ষমা করে দিলাম, কারণ আমি চাই না কেয়ামতের দিন নবীজি (স.)-এর চাচার বংশধররা আমার কারণে জবাবদিহির মুখোমুখি হন।’ এই মহানুভবতা আমাদের আহলে বাইতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অনুপম দৃষ্টান্ত শিক্ষা দেয়।

শেষ কথা, আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা ও ঈমানের অংশ। এটি রাসুল (স.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসারই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। তাঁদের সম্মান করা, প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। তবে, এই ভালোবাসা অবশ্যই শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থাকতে হবে, যা কোনো ধরনের অতিরঞ্জন থেকে মুক্ত। আল্লাহ আমাদের সকলকে আহলে বাইতের প্রতি সঠিক ভালোবাসা পোষণের তাওফিক দান করুন এবং তাঁদের ভালোবাসাকে আমাদের ঈমান পরিপূর্ণ হওয়ার মাধ্যম করে দিন।

(ইবনে মাজাহ; সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম; তিরমিজি; তাফসির ইবনে কাসির)