ধর্ম ডেস্ক
২৬ আগস্ট ২০২৫, ০৫:৫৩ পিএম
শয়তান মানুষের অন্তরে খারাপ চিন্তা ও কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে তাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে। ইসলামে এটি ওয়াসওয়াসা নামে পরিচিত। শয়তানের এই কুমন্ত্রণা মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তাকে পাপের দিকে প্ররোচিত করে এবং ইবাদতে একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়। তবে, আল্লাহ তাআলা কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে এর মোকাবিলার সহজ ও কার্যকর উপায় শিখিয়ে দিয়েছেন। এই প্রতিবেদনে আমরা শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার প্রথম এবং প্রধান উপায় হলো সরাসরি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। যখনই মনে শয়তানের কুমন্ত্রণা আসবে, তখনই আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। সুরা নাস এই বিষয়ে একটি শক্তিশালী সমাধান দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন- قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ. مَلِكِ النَّاسِ. إِلَٰهِ النَّاسِ. مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ. الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ. مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ ‘বলুন, আমি আশ্রয় নিচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির, মানুষের ইলাহের কাছে, সেই কুমন্ত্রণা দানকারীর অনিষ্ট থেকে, যে পিছপা হয় এবং মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, জিন ও মানুষের মধ্য থেকে।’ (সুরা নাস: ১-৬)
এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায় যে, একমাত্র আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েই আমরা ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি পেতে পারি।
আরও পড়ুন: শয়তানের হাজারো ফাঁদ থেকে সন্তানকে রক্ষার দোয়া
রাসুলুল্লাহ (স.) শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দোয়া ও আমলের নির্দেশ দিয়েছেন। এগুলো শয়তানের বিরুদ্ধে মুমিনের শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে।
ক. আউজুবিল্লাহ বলা: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (স.) বলেছেন- ‘শয়তান কারো মনে কুমন্ত্রণা দিলে, সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়।’ (সহিহ বুখারি: ৩২৭৬)
খ. মসজিদ প্রবেশের বিশেষ দোয়া: ‘যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশের সময় বলবে: ‘أَعُوذُ بِاللهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ’ (আমি মহান আল্লাহর কাছে, তাঁর সম্মানিত চেহারার ও প্রাচীন ক্ষমতার দোহাই দিয়ে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই), তখন শয়তান বলে, এই ব্যক্তি আজ সারাদিনের জন্য আমার অনিষ্ট হতে রক্ষা পেল।’ (আবু দাউদ: ৪৬৬)
গ. ধীরস্থিরতা ও ভালো চিন্তা: রাসুল (স.) বলেছেন- ‘আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের জন্য কথা কাজে পরিণত না করা পর্যন্ত তাদের মনের কল্পনাগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম: ১২৭)
এই হাদিসটি আমাদের মনে প্রশান্তি দেয় যে, ওয়াসওয়াসা আসাটা স্বাভাবিক, কিন্তু এর অনুসরণ করা যাবে না।
আরও পড়ুন: আয়াতুল কুরসির ফজিলত শিখিয়ে শয়তানের মুক্তির ঘটনা
কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুসরণ করে কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ওয়াসওয়াসা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায়।
তাৎক্ষণিক আশ্রয় চাওয়া: খারাপ চিন্তা এলে সাথে সাথে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ বলুন এবং মনকে অন্যকোনো ভালো কাজে ব্যস্ত করে ফেলুন।
নিয়মিত দোয়া ও জিকির: সকাল-সন্ধ্যায় মাসনুন দোয়াগুলো পড়ুন। আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস করুন। আল্লাহর জিকির শয়তানকে দূরে রাখে।
কোরআন তেলাওয়াত: নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করলে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং শয়তানের প্রভাব কমে যায়।
ইস্তেগফার ও তাওবা: গুনাহ থেকে বিরত থাকলে শয়তানের প্রভাব কমে যায়। নিয়মিত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করুন এবং তওবা করুন।
সৎ সঙ্গ ও জ্ঞানার্জন: ভালো মানুষের সঙ্গে সময় কাটান এবং দ্বীনি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ঈমানকে শক্তিশালী করুন। এতে শয়তান ওয়াসওয়াসা দেওয়ার সুযোগ কম পায়।
নামাজে মনোযোগ: একাগ্রতার সাথে নামাজ পড়ুন। শয়তান চায় না মুমিন তার সালাত থেকে পরিপূর্ণ ফায়দা লাভ করুক, তাই নামাজের মধ্যে ওয়াসওয়াসা বেশি আসে।
সরলতা অবলম্বন: ঈমান সম্পর্কিত সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা এড়িয়ে সহজভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
শয়তানের কুমন্ত্রণা বা ওয়াসওয়াসা প্রতিটি মুসলিমের জন্য একটি পরীক্ষা। তবে কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে, মাসনুন দোয়া ও নিয়মিত আমল অনুসরণ করলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল, আর আল্লাহর সাহায্য অত্যন্ত শক্তিশালী। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখে, শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ রাখুন এবং দৃঢ় ঈমান ও সৎ আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।