ধর্ম ডেস্ক
২৩ জুন ২০২৫, ১২:২৯ পিএম
ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মুনাফিকদের, যারা মুখে মুসলমান হলেও অন্তরে দ্বন্দ্ব ও মিথ্যা ধারণা লালন করে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন- ‘হে নবী! আপনি কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন। তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম এবং তা কতই না নিকৃষ্ট ঠিকানা।’ (সুরা তাওবা: ৭৩)
আরও ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ও কাফেরদের জন্য জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটা তাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, এবং তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী শাস্তি।’ (সুরা তাওবা: ৬৮)
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সাহাবিরা নিফাক বা মুনাফিকির ভয় এতই গভীরভাবে অনুভব করতেন যে তাঁরা সর্বদা নিজের অন্তর পর্যালোচনা করতেন।
আবু দারদা (রা.) যখন সালাতশেষে তাশাহহুদ পড়তেন, আল্লাহর নিকট নিফাক থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেক দোয়া করতেন। তাঁর অবস্থা দেখে এক সাহাবি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি ব্যাপার হে আবু দারদা! তুমি নিফাককে এত ভয় কর কেন? তখন তিনি বললেন, আমাকে আপন অবস্থায় থাকতে দাও। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, একজন লোক মুহূর্তের মধ্যেই তার দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। ফলে সে দ্বীন হতে বের হয়ে যায়।’ (সিয়ারে আ-লামুন নুবালা: ৬/৩৮২)
আরও পড়ুন: নবীজিকে যেভাবে অনুসরণ করতেন সাহাবিরা
সাহাবি হানজালা (রা.) একবার নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, “হানজালা মুনাফিক হয়ে গেছে।” কারণ তিনি রাসুল (স.)-এর সান্নিধ্যে থাকলে আখেরাত এত জীবন্ত মনে হতো, আর সংসার জীবনে ফিরে গেলে তা কমে যেত।
এই অবস্থায় তিনি আবু বকর (রা.)-এর কাছে গেলে তিনিও একই অবস্থা প্রকাশ করলেন। তারা এই বিষয় নিয়ে রাসুল (স.)-এর কাছে যান, তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেন- ‘যদি তোমরা সবসময় বর্তমান অবস্থায় থাকতে, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের সঙ্গে হাত মিলাত। কিন্তু কিছু সময় এ রকম থাকবে, কিছু সময় অন্য রকম।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৫০)
খলিফা ওমর ইবন খাত্তাব (রা.) যিনি দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন, তিনিও নিফাকের ভয় করতেন। একবার একজনের জানাজায় অংশ নিতে চাইলে হুজাইফা (রা.) তাকে নিষেধ করেন, কারণ ওই ব্যক্তি মুনাফিক ছিল। তখন ওমর (রাঃ) প্রশ্ন করেন, ‘তুমি আল্লাহর কসম করে বলো, আমি কি তাদের অন্তর্ভুক্ত?’ (ইবন আবি শাইবা এটি বর্ণনা করেছেন, আল-মুসান্নাফ: ৮/৬৩৭)
এই কথায় সাহাবিদের নিফাকভীতি ছিল অনেক বেশি।
ইবনে আবি মুলাইকা (রহ.) বলেন, ‘আমি রাসুল (স.)-এর ৩০ জন সাহাবিকে দেখেছি, যারা প্রত্যেকেই নিজের মধ্যে নিফাকের আশঙ্কা করতেন। কেউ বলেননি, তাদের ঈমান ফেরেশতা জিবরাইল বা মিকাইলের মতো।’ (সহিহ বুখারি: ১/২৬)
আরও পড়ুন: যে ফেতনাকে সাহাবিরা বেশি ভয় করতেন
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেন, ‘অনেকের অন্তর ঈমান ও নিফাকের ভয়ভীতিতে পরিপূর্ণ ছিল, আর আজ অনেকের ঈমান গলাও অতিক্রম করেনি, তবুও দাবি করেন জিবরাইল-মিকাইলের মতো ঈমান।’ (মাদারেজুস সালেকিন: ১/৩৫৮)
সাহাবিরা মূলত ‘বড় নিফাক’ (যা দ্বীন থেকে বের করে দেয়) নয়, বরং ‘ছোট নিফাক’, যা ঈমানের সঙ্গে মিশে থাকে—এ নিয়ে ভয় করতেন। অথচ এ নেফাকের কারণে বড়জোর মুনাফিক মুসলিম হবে, মুনাফিক কাফির হবে না। (এহইয়াউ ‘উলুমুদ্দিন: ৪/১৭২) ছোট নিফাক যেমন মুখে ভালো কথা বলা কিন্তু অন্তরে ভিন্ন চিন্তা রাখা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, আমানতখোরি ইত্যাদি।
আজকের মুসলিমদের উচিত সাহাবিদের মতো নিজেদের অন্তর নিয়মিত পর্যালোচনা করা, নিফাকের যেকোনো ছোঁয়া চিহ্নিত করে তৎক্ষণাৎ তা থেকে মুক্ত হওয়া। কারণ নিফাক ঈমানকে ধ্বংস করে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও বিরূপ প্রভাব ফেলে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিফাক থেকে রক্ষা করুন এবং হৃদয়কে খাঁটি ঈমানের আলোয় আলোকিত করুন। আমিন।