Dhaka Mail Logo

ইসলাম

কোরবানির গোশত বণ্টনে যে ভুল করা যাবে না

ধর্ম ডেস্ক

০৭ জুন ২০২৫, ০৪:২৩ পিএম

ঈদুল আজহায় কোরবানির গোশত সঠিকভাবে বণ্টন করা শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এ বিষয়ে অসতর্ক হলে ইবাদতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ অনেকেই অজ্ঞতাবশত কিছু গুরুতর ভুল করে থাকেন। আলেম ও ফকিহদের বরাতে এখানে সেই ভুলগুলো এবং শরিয়তের সঠিক বিধান তুলে ধরা হলো।

মান্নতের কোরবানি হলে গোশত খাওয়া যাবে না

কেউ মান্নত আদায়ের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করলে সেই গোশতের পুরোটাই গরিবদের মাঝে বিতরণ করা ওয়াজিব। মান্নতকারী নিজে বা তার পরিবারের কেউ এই গোশত খেতে পারবেন না। কোনো কোনো এলাকায় কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে গোশত সংগ্রহ করে মহল্লাব্যাপী বিতরণ করা হয়; এতে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই অংশ পান। মান্নতের পশুর ক্ষেত্রে এটি শরিয়তবিরোধী। তবে কেবল গরিবদের মাঝে বণ্টন হলে তা বৈধ। (ফতোয়ায়ে কাসিমিয়া: ১৭/৮২-৮৩)

শরিকে কোরবানিতে অসমান ভাগ করা যাবে না

একাধিক ব্যক্তি মিলে কোরবানি করলে প্রত্যেকের অংশ সমান হতে হবে এবং কারও অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হওয়া যাবে না। কারও অংশ কম হলে সংশ্লিষ্ট কারও কোরবানিই গ্রহণযোগ্য হবে না বলে ফকিহরা উল্লেখ করেছেন।
বাদায়েউস সানায়েতে ইমাম কাসানি (রহ.) বলেন- ‘গরু বা উটে সাতজনের বেশি শরিক হওয়া জায়েজ নেই। প্রত্যেক শরিকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হলে কোরবানি সহিহ হবে না।’ (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৭)

আরও পড়ুন: যেভাবে কোরবানি করলে কবুল হয়

অনুমান করে গোশত বণ্টনে সতর্কতা

একাধিক ব্যক্তি মিলে কোরবানি করলে (শরিকানা কোরবানি) তাদের মধ্যে গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ফকিহদের মতে, শরিকদের হক যথাযথভাবে আদায় নিশ্চিত করতে সাধারণভাবে ওজন করে বণ্টন করা উত্তম। কারণ অনুমানভিত্তিক বণ্টনে কারো অংশ কম-বেশি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

তবে যদি গোশতের সঙ্গে হাড়, মাথা বা পায়ের অংশ যুক্ত থাকে এবং মোটামুটি সমতার ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়, তাহলে সামান্য তারতম্য মার্জনীয় হতে পারে বলে ফিকহবিদরা উল্লেখ করেছেন। এরপরও ইনসাফ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দাঁড়িপাল্লা বা আধুনিক ওজনযন্ত্রের মাধ্যমে বণ্টন করাই সর্বোত্তম পদ্ধতি। (দুররুল মুখতার: ৬/৩১৭; ফতোয়ায়ে কাজিখান: ৩/৩৫১)

কসাইকে গোশত বা চামড়া পারিশ্রমিক দেওয়া নিষিদ্ধ

কোরবানির গোশত, চামড়া বা কোনো অংশ কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া বৈধ নয়। কসাইয়ের মজুরি আলাদা অর্থে পরিশোধ করতে হবে। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত- ‘রাসুল (স.) আমাকে তাঁর কোরবানির পশু জবাই করতে এবং পশুর গোশত, চামড়া ও নাড়িভুঁড়ি সদকা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর এগুলোর কোনো কিছু কসাইকে দিতে নিষেধ করেছেন।’ (সহিহ বুখারি: ১৭১৭; সহিহ মুসলিম: ১৩১৭)

একই কারণে কোরবানির গোশত, চর্বি বা চামড়া বিক্রি করাও নিষিদ্ধ। বিক্রি করলে পুরো মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৫; কাজিখান: ৩/৩৫৪; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩০১)

আরও পড়ুন: কোরবানির চামড়ার আসল হকদার কে? 

যা করা বৈধ

গোশত (মান্নত না হলে) সংরক্ষণ করা জায়েজ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমরা কোরবানির গোশত খাও, জমা রাখো এবং সদকা করো।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৭২; সহিহ বুখারি: ৫৫৬৯)
ধনী বা অমুসলিম প্রতিবেশীকে উপহার হিসেবে গোশত দেওয়াও বৈধ। এটি সামাজিক সম্প্রীতির দৃষ্টিতে উত্তম আমল। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩০০; ইলাউস সুনান: ৭/২৮৩)
আকিকার গোশতের বিধান কোরবানির মতোই; মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, ধনী-গরিব সবাই খেতে পারেন। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩০৪; ইলাউস সুনান: ১৭/১১৮)

কোরবানির গোশত বণ্টন একদিকে সুস্থ সামাজিক রেওয়াজ; অন্যদিকে শরিয়তের সুনির্দিষ্ট বিধানের অংশ। সঠিক নিয়মে বণ্টন না হলে ইবাদতের পূর্ণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কোরবানির আগেই এই মাসআলাগুলো জেনে রাখা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা প্রতিটি কোরবানিদাতার কর্তব্য।

বুখারি: ১৭১৭, ৫৫৬৯; মুসলিম: ১৩১৭, ১৯৭২; বাদায়ে: ৪/২০৭, ৪/২২৫; দুররুল মুখতার: ৬/৩১৭; কাজিখান: ৩/৩৫১, ৩৫৪; হিন্দিয়া: ৫/৩০০, ৩০১, ৩০৪; কাসিমিয়া: ১৭/৮২-৮৩; ইলাউস সুনান: ৭/২৮৩, ১৭/১১৮