ধর্ম ডেস্ক
১১ মে ২০২৫, ০৮:০৭ পিএম
কোরবানি ইসলামের একটি মহান নিদর্শন এবং সামর্থ্যবান মুমিনের ওপর ওয়াজিব ইবাদত। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি আদায় করুন।’ (সুরা কাউসার: ২)
কোরবানির মূল সারকথা হলো বান্দার আনুগত্য ও তাকওয়া। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন- لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ‘আল্লাহর কাছে এগুলোর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না, বরং তোমাদের তাকওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে।’ (সুরা হজ: ৩৭)
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির মধ্যে চারটি শর্ত থাকা আবশ্যক।
প্রথমত, ব্যক্তিকে মুসলিম হতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে। তৃতীয়ত, মুকিম হতে হবে- অর্থাৎ নিজ এলাকায় অবস্থান করতে হবে; মুসাফিরের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। চতুর্থত, ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে। (আল মুহিতুল বুরহানি: ৬/৮৫)
আরও পড়ুন: কত টাকা থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হয়?
সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা বা সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হয়। বর্তমান বাজারে রুপার মূল্য কম হওয়ায় ফুকাহায়ে কেরাম রুপার নিসাবকেই (৫২.৫ ভরি) কোরবানির মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
নিসাবের হিসাবে যেসব সম্পদ গণনায় আসবে- নগদ টাকা ও ব্যাংকে জমানো অর্থ; স্বর্ণ ও রুপার অলংকার; বিক্রির নিয়তে রাখা ব্যবসায়িক পণ্য-যেমন গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট, ফার্নিচার ইত্যাদি। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭১০৩) এ ছাড়া মৌলিক প্রয়োজন- বসবাসের ঘর, কাপড়, খাবার, পেশার সরঞ্জাম ও ব্যক্তিগত বাহন বাদে অতিরিক্ত জমি, অব্যবহৃত আসবাবপত্র বা ইলেকট্রনিক সামগ্রীর মূল্যও নিসাবে যুক্ত হবে। (আহসানুল ফতোয়া: ৭/৫০৬)
ভাড়ায় চালিত গাড়ি বা ভাড়া দেওয়া ঘর ও দোকানের মূল দামের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয় না। তবে এসব সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের যে অংশ প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পরও সঞ্চিত থাকবে, তা নিসাবে গণ্য হবে। (দুররুল মুখতার: ২/২৭৩; ফতোয়ায়ে খানিয়া: ১/২৫১)
আরও পড়ুন: কোরবানির সঙ্গে আকিকা, ছেলে সন্তানের জন্য কত অংশ জরুরি?
কোরবানির নির্ধারিত তিন দিন- ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ অতিবাহিত হয়ে গেলে আর কোরবানি করার সুযোগ থাকে না। এই সময়ের মধ্যে কোনো কারণে কোরবানি দেওয়া না হলে একটি মধ্যম মানের বকরির মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার: ৯/৪৫২)
কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পর যদি কেউ তা না দেয় এবং পরবর্তীতে দরিদ্র হয়ে পড়ে, তবুও সেই কোরবানির দায় মাফ হয় না। তাকে একটি ছাগলের মূল্য সদকা করতে হবে অথবা মৃত্যুর আগে এ বিষয়ে অসিয়ত করে যেতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬৫)
কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পরও যারা তা পালন করে না, তাদের ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যার সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম: ৩৫১৯) তবে মুহাদ্দিসগণ বর্ণনাটিকে সনদের দিক থেকে দুর্বল বলেছেন। অর্থগতভাবে অন্য সহিহ হাদিসে হজের বিলম্বকারীদের সম্পর্কে যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা থেকে ওয়াজিব ইবাদত ত্যাগের ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়।
কোরবানি আল্লাহর কাছে বান্দার আনুগত্য ও ত্যাগের প্রতীক। নিসাবের হিসাব জটিল মনে হলে একজন বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন। সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের উচিত এই ওয়াজিব ইবাদত যথাসময়ে আদায় করা।