ধর্ম ডেস্ক
২৭ মার্চ ২০২৫, ০৫:৫৫ পিএম
রমজানে মসজিদে মসজিদে খতম তারাবির আয়োজন করা হয় মূলত কোরআন নাজিলের মাসে মহান আল্লাহর কালামকে একবার পূর্ণাঙ্গভাবে শোনার তাগিদে। কিন্তু বর্তমান সময়ে তারাবি শেষে হাফেজদের মোটা অঙ্কের ‘হাদিয়া’ বা পারিশ্রমিক দেওয়ার বিষয়টি একটি সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। ইবাদত কি কখনো অর্থের বিনিময়ে পণ্য হতে পারে? কোরআন পাঠ করে দুনিয়াবি সম্পদ কামনার ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল (স.)-এর কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। খতম তারাবির বিনিময় গ্রহণ এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ‘হিলা’ বা বাহানা সম্পর্কে ইসলামের অকাট্য দলিল ও নির্ভরযোগ্য ফতোয়াগুলো কী বলে- তা আমাদের প্রত্যেকের জেনে রাখা জরুরি।
খতম তারাবির বিনিময়ের বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা ও নির্ভরযোগ্য ফতোয়াগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
ইসলামে খতম তারাবির বিনিময় দেওয়া-নেওয়া দুটোই নাজায়েজ। হাদিয়ার নামে দেওয়াও জায়েজ নেই। এক মাসের জন্য নিয়োগ দিয়ে বেতন হিসাবে দিলেও জায়েজ নেই।
হজরত আবদুর রহমান ইবনে শিবল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা কোরআন পড়ো তবে তাতে বাড়াবাড়ি করো না এবং তার প্রতি বিরূপ হয়ো না। কোরআনের বিনিময় ভক্ষণ করো না এবং এর দ্বারা সম্পদ কামনা করো না।’ (মুসনাদে আহমদ: ৩/৪২৮; মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ৫/২৪০; কিতাবুত তারাবিহ)
আরও পড়ুন: তারাবি নামাজ: সুন্নাহভিত্তিক নিয়ম ও দোয়া
হজরত ইমরান ইবনে হোসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা কোরআন পড়ো এবং আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করো। তোমাদের পরে এমন জাতি আসবে, যারা কোরআন পড়ে মানুষের কাছে প্রার্থনা করবে।’ (মুসনাদে আহমদ: ৪/৪৩৭; জামে তিরমিজি: ২/১১৯)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাকিল থেকে বর্ণিত, তিনি এক রমজান মাসে লোকদের নিয়ে তারাবি পড়লেন। এরপর ঈদের দিন উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ (রহ) তাঁর কাছে এক জোড়া কাপড় এবং পাঁচশ দিরহাম পাঠালেন। তখন তিনি কাপড় জোড়া ও দিরহামগুলো এই বলে ফেরত দিলেন যে, আমরা কোরআনের বিনিময় গ্রহণ করি না।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ৫/২৩৭)
আসলে খতম তারাবি খালেস একটি ইবাদত, যা নামাজ ও রোজার মতো ইবাদতে মাকসুদার অন্তর্ভুক্ত। আর এ ধরনের ইবাদতের বিনিময় বা বেতন দেওয়া-নেওয়া উম্মতে মুসলিমার ঐকমত্যের ভিত্তিতে নাজায়েজ। এতে কোনো মাজহাবের মতপার্থক্য নেই।
আরও পড়ুন: টাকার বিনিময়ে মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন তেলাওয়াত করা যাবে কি?
কিন্তু পরবর্তী ফকিহদের মতে, ফরজ নামাজের ইমামতির বেতন নেওয়া জায়েজ। কিন্তু সুন্নত জামাতের ইমামতি এর অন্তর্ভুক্ত নয়। আর হাফেজদের দেওয়া বিনিময়কে জায়েজ করার জন্য হিলা অবলম্বন করা একটা বাহানামাত্র, যা পরিহার করা জরুরি।
হিলা মানে- তারাবি পড়ানোর পাশাপাশি হাফেজকে দিয়ে কয়েক ওয়াক্ত ফরজ নামাজের ইমামতি করানো। যাতে খতমের টাকাটা দেওয়ার বাহানা পাওয়া যায় যায়। অর্থাৎ এই টাকাটা ফরজের ইমামতির জন্যই দেওয়া হচ্ছে এমনটা বোঝানো যায়। কিন্তু এর অনুমতি ইসলামি শরিয়তে নেই। কারণ খতম তারাবি না পড়ালে ওই দুয়েক ওয়াক্তের জন্য আসলে তাকে টাকা দেওয়া হতো না। এজন্যই আকাবিরের অনেকে এই হিলা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর দলিলের ভিত্তিতেও তাদের ফতোয়াই সহিহ। (দ্র. ইমদাদুল ফতোয়া: ১/৩২২; ইমদাদুল আহকাম: ১/৬৬৪)
(আরও দেখুন ফতোয়ায়ে শামি: ৬/৫৭; তানকিহুল ফতোয়া হামিদিয়া: ২/১৩৭-১৩৮; আলইখতিয়ার লিতালিলিল মুখতার: ২/৬২; শিফাউল আলিল ওয়াবাল্লুল গালিল (রাসায়েলে ইবনে ইবনে আবেদিন) ১/১৫৪-১৫৫; ইমদাদুল ফতোয়া: ১/৩১৫-৩১৯ ও ৩২২)