ধর্ম ডেস্ক
১২ নভেম্বর ২০২৪, ০১:০৯ পিএম
অপরাধ বলতে সাধারণত ব্যভিচার, চুরি, অত্যাচার ইত্যাদি অপকর্মকে বোঝে অধিকাংশ মানুষ। অথচ পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ এসব অপরাধে লিপ্ত নয়, বরং অন্তরের পাপ বা আত্মার ব্যাধিতে আক্রান্ত। যেমন- ঈমানহীনতা, অহংকার, হিংসা, রিয়া, মোহ, দাম্ভিকতা ইত্যাদি। এসব পাপই সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে বেশি দায়ী।
কারো অন্তর অসুস্থ হলে তার কোনোকিছুই সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। এজন্যই নবীজি আগে অন্তর পরিশুদ্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন। ‘সাবধান! নিশ্চয়ই মানবদেহে একখণ্ড গোশতের টুকরো আছে, যখন তা সুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরটাই সুস্থ হয়ে যায় এবং যখন তা অসুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরই অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রেখো! এটাই হচ্ছে কলব।’ (সহিহ মুসলিম: ৪১৭৮)
হাদিসের শেষাংশে রাসুলুল্লাহ (স.) আত্মশুদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন। আত্মা পরিশুদ্ধ না হলে মানুষের জীবনের কোনো কিছু সুন্দর ও সুস্থভাবে পরিচালিত হয় না। এ জন্য আল্লাহ বলেছেন, ‘সে-ই সফল যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং যে তার আত্মাকে কলুষিত করেছে সে ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আশ-শামস: ৮-৯)
আরও পড়ুন: অহংকার আল্লাহর চাঁদর, টানাটানি করলেই শাস্তি
যার মধ্যে অন্তরের ব্যাধি নেই, সে-ই সর্বোত্তম মানুষ। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বলা হলো, কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি।’ সাহাবিরা বলেন, সত্যভাষীকে তো আমরা চিনি; কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, ‘সে হলো পূত-পবিত্র নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার কোনো গুনাহ নেই, দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মঅহমিকা ও কপটতা নেই।’ (ইবনে মাজাহ: ৪২১৬)
কোরআন ও হাদিসের একাধিক স্থানে অন্তরের ব্যাধির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। নিচে অন্তরের মারাত্মক ব্যাধিগুলো তুলে ধরা হলো।
১. আল্লাহকে ভয় না করা
আল্লাহর ভয় যার অন্তরে নেই, তারা দ্বারা সবরকম অপরাধ করা সম্ভব। এসব লোক সমাজের বোঝা এবং আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? মূলত আল্লাহর পাকড়াও থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই নিশ্চিত হতে পারে।’ (সুরা আরাফ: ৯৯)
আরও পড়ুন: ঝগড়া এড়িয়ে চলার প্রতিদান
২. আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হওয়া
শয়তান মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত করতে চায়, আল্লাহর রহমতের কথা ভুলিয়ে দিতে চায়। আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহ এবং দয়াকে আড়াল করে ফায়দা লুটে। তার ফাঁদে পা দিয়ে নিরাশ হওয়া মানে অন্তরের ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া। এজন্যই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে ভ্রষ্ট ব্যক্তিরাই নিরাশ হয়ে থাকে।’ (সুরা হিজর: ৫৬)
৩. মন্দ ধারণা পোষণ
সুন্দর ও উন্নত সমাজ বিনির্মাণে মানুষে মানুষে সুধারণা পোষণ করতে উৎসাহিত করেছে ইসলাম। মন্দ ধারণা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য দায়ী। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা অধিক পরিমাণ ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয়ই কিছু কিছু ধারণা পাপতুল্য।’ (সুরা হুজরাত: ১২)
৪. অহংকার
অহংকারীরা পৃথিবীর আবর্জনা। পরকালে জাহান্নামের অঙ্গার। তাদেরকে বলা হবে- জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ করো, তোমাদেরকে চিরকাল এখানে থাকতে হবে। অহংকারীদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট!’ (সুরা যুমার: ৭২) রাসুলুল্লাহ (স.) অহংকার সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, ‘যার অন্তরে এক সরিষার দানা পরিমাণ পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ১৬৮)
আরও পড়ুন: অন্যের প্রতি ভালো ধারণা: ইসলাম কী বলে?
৫. অন্যকে তাচ্ছিল্য করা
অন্যকে যারা তাচ্ছিল্য করে তারা খুব বাজে লোক। এসব লোক থেকে দূরে থাকা উচিত। হাদিস শরিফে তাচ্ছিল্যকারীকে নিকৃষ্ট লোক বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির মন্দ প্রমাণিত হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে।’ (ইবনে মাজাহ: ৪২১৩) আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা দেখবে তাদের দুষ্কর্মগুলো। তা তাদের ঘিরে ফেলবে। (অথচ) এসব বিষয় নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত।’ (সুরা ঝুমার: ৪৮)
আত্মার ব্যাধি থেকে বাঁচার উপায়
অন্তরের ব্যাধি থেকে আত্মরক্ষার উপায় হলো- আল্লাহর কাছে তাওবা করা। নেক কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। সৎ চিন্তা ও ভালো কাজের ইচ্ছা নিজের ভেতর জাগ্রত করা। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির করা। সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্য কামনা করা। স্বয়ং রাসুলে আকরাম (স.) সুস্থ হৃদয় লাভের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে বরফ ও শীতল পানি দিয়ে ধৌত করুন। আর আমার অন্তর গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দিন, যেভাবে আপনি শুভ্র বস্ত্রের ময়লা পরিষ্কার করে থাকেন এবং আমাকে আমার গুনাহ থেকে এতটা দূরে সরিয়ে রাখুন, পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তকে পশ্চিম প্রান্ত থেকে যত দূরে রেখেছেন।’ (বুখারি : ৬৩৭৭)