images

ইসলাম

নবীদের ধর্ম কি আলাদা?

ধর্ম ডেস্ক

১২ মে ২০২৪, ০৮:১৫ পিএম

মানুষের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ মনোনীত মহামানবদের ‘নবী-রাসুল’ বলা হয়। আল্লাহর মনোনীত সবাই নবী। এদের মধ্যে যাদের নতুন কিতাব ও শরিয়ত দেওয়া হয়েছে তাদের রাসুলও বলা হয়। রাসুলদের ধর্ম আলাদা নয়, শরিয়ত কিছুটা আলাদা। রাসুলরা নিজ নিজ শরিয়ত অনুযায়ী দ্বীনের কাজ করতেন। আর যেসব নবীর প্রতি কিতাব নাজিল হয়নি তাঁরা আগের রাসুলদের প্রচারিত শরিয়তের অনুসরণ করে দ্বীনের কাজ আঞ্জাম দিতেন। 

সব নবীর ধর্ম বা দ্বীন এক—এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيْسَى ابْنِ مَرْيَمَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَالأَنْبِيَاءُ إِخْوَةٌ لِعَلَاتٍ أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِيْنُهُمْ وَاحِدٌ ‘আমি দুনিয়া ও আখিরাতে ‘ঈসা ইবনু মরিয়মের ঘনিষ্ঠতম। নবীগণ একে অন্যের বৈমাত্রিয় ভাই। তাঁদের মা ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু দ্বীন হল এক।’ (সহিহ বুখারি: ৩৪৪৩)

পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে পূর্ববর্তী নবী ও তাঁর অনুসারীদের ব্যাপারে মুসলিম শব্দের ব্যবহার রয়েছে, যা নবীদের দ্বীন অভিন্ন হওয়ার প্রমাণ বহন করে। মহান আল্লাহ বলেন- وَ وَصّٰی بِهَاۤ اِبۡرٰهٖمُ بَنِیۡهِ وَ یَعۡقُوۡبُ ؕ یٰبَنِیَّ اِنَّ اللّٰهَ اصۡطَفٰی لَکُمُ الدِّیۡنَ فَلَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَ اَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ ‘ইবরাহিম ও ইয়াকুব এ বিষয়ে তাদের পুত্রদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিল, হে পুত্ররা! আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৩২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- قُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا بِاللّٰهِ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡنَا وَ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلٰۤی اِبۡرٰهٖمَ وَ اِسۡمٰعِیۡلَ وَ اِسۡحٰقَ وَ یَعۡقُوۡبَ وَ الۡاَسۡبَاطِ وَ مَاۤ اُوۡتِیَ مُوۡسٰی وَ عِیۡسٰی وَ مَاۤ اُوۡتِیَ النَّبِیُّوۡنَ مِنۡ رَّبِّهِمۡ ۚ لَا نُفَرِّقُ بَیۡنَ اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ ۫ۖ وَ نَحۡنُ لَهٗ مُسۡلِمُوۡنَ ‘তোমরা বলো আমরা ঈমান রাখি আল্লাহতে এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি ও ইবরাহিম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরদের প্রতি। আর যা তাঁদের প্রতিপালকের কাছ থেকে মুসা, ঈসা ও অন্য নবীদের দেওয়া হয়েছে। আমরা তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না এবং তাঁর অনুগত (মুসলিম)।’ (সুরা বাকারা: ১৩৬)

আরও পড়ুন: মানবজাতি থেকেই কেন নবী-রাসুল?

মহান আল্লাহ আরও বলেন- یٰۤاَیُّهَا الرُّسُلُ کُلُوۡا مِنَ الطَّیِّبٰتِ وَ اعۡمَلُوۡا صَالِحًا ؕ اِنِّیۡ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ عَلِیۡمٌ  وَ اِنَّ هٰذِهٖۤ اُمَّتُکُمۡ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّ اَنَا رَبُّکُمۡ فَاتَّقُوۡنِ ‘হে রাসুলরা! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং ভালো কাজ করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আমি অবগত। তোমাদের এই জাতি তো একই জাতি এবং আমি তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং আমাকে ভয় করো।’ (সুরা মুমিনুন: ৫১-৫২)

নবীদের মিশন ছিল অভিন্ন। পৃথিবীর সব নবী ও রাসুল আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস, শিরক থেকে বিরত থাকা এবং স্বীয় শরিয়ত তথা ধর্মীয় জীবনবিধানের আনুগত্য করার আহ্বান জানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে রাসুল প্রেরণ করেছি—(যেন তারা নির্দেশ দেয়) তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে পরিহার করো।’ (সুরা নাহল: ৩৬)

এমনকি সব নবী-রাসুলের শরিয়তের মৌলিক বিধানও অভিন্ন ছিল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন, যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন নুহকে আর যা আমি অবতীর্ণ করেছি তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে—এই বলে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে মতভেদ করো না।’ (সুরা আশ-শুরা: ১৩)

আরও পড়ুন: পৃথিবীতে নবী-রাসুলদের আগমনের ধারা

উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘দ্বীন যা সব রাসুলই নিয়ে এসেছিলেন।’ অতঃপর তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর হাদিস উদ্ধৃত করেন, ‘আমরা নবীরা বৈমাত্রেয় ভাই; আমাদের দ্বীন এক।’ এরপর ইবনে কাসির বলেন, ‘নবীদের মধ্যে অভিন্ন বিষয় হলো এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সঙ্গে কারো শরিক না করা। যদিও তাদের শরিয়ত ও কর্মপদ্ধতি ভিন্ন ছিল।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির, পৃষ্ঠা-১৬৬৫)

মূলত ধর্মের ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর নির্দেশনা অস্বীকার ও অন্ধ অনুকরণের কারণে। ফলে একই অনুসারীদের ধর্মীয় জীবনে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে পরিচয়েও ভিন্নতা তৈরি হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে ইসলামই আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন। যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল তারা পরস্পর বিদ্বেষবশত তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও মতবিরোধ করেছিল।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯)

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি এর আগে অবতীর্ণ কিতাবের সমর্থক ও সংরক্ষক হিসেবে। সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে তাদের বিচার নিষ্পত্তি করো এবং যে সত্য তোমার কাছে এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শরিয়ত ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ (সুরা মায়িদা: ৪৮)

নবী-রাসুলদের অস্বীকারকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন প্রত্যাশা করে? যখন আকাশে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবাই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আর তাঁর দিকেই প্রত্যানীত হয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান: ৮৩)

প্রসঙ্গত, কোরআন নাজিলের মাধ্যমে আগের রাসুলদের শরিয়ত রহিত হয়ে গেছে। এখন মুহাম্মদ (স.)-এর শরিয়তই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। আগেকার কোনো শরিয়তের শুধু ওই সকল বিধানই মানা যাবে, যেগুলো কোরআন সাপোর্ট করে। (সুরা মায়েদা: ৪৮; মুসনাদে আহমদ: ১৪৭৩৬, মেশকাত: ১৭৭)