ধর্ম ডেস্ক
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩৭ এএম
কৃতজ্ঞ বান্দারা আল্লাহর কাছে অনেক দামী। সবসময় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা নবী-রাসুলদের চারিত্রিক ভূষণ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের অনেক জায়গায় কৃতজ্ঞ বান্দাদের কথা তুলে করেছেন।
আল্লাহ তাআলা দাউদ (আ.)-কে বলেছিলেন, ‘হে দাউদ-পরিবার, কৃতজ্ঞতাসহকারে কাজ করে যাও। (যদিও) আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ।’ (সুরা সাবা: ১৩)
দাউদ (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আমার পালনকর্তা, আমি আপনার শুকরিয়া কীভাবে আদায় করব? আমার ভাষাগত ও কর্মগত শুকরিয়া তো আপনারই দান। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে দাউদ, এখন তুমি আমার শুকরিয়া আদায় করেছ। কেননা আমার যথাযথ শুকরিয়া আদায়ের ক্ষেত্রে তোমার অক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছ এবং মুখে তা স্বীকার করেছ। (তাফসিরে ইবনে কাসির)
নুহ (আ.) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের সন্তান, যাদের আমি নুহের সঙ্গে নৌকার উঠিয়েছিলাম এবং নুহ একজন কৃতজ্ঞ বান্দা ছিলেন।’ (সুরা ইসরা: ৩)
আরও পড়ুন: দুঃখের সময় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লে কী হয়
ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই ইবরাহিম ছিলেন এক সম্প্রদায়ের প্রতীক, সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহরই অনুগত এবং তিনি শিরককারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন আল্লাহর নিয়ামতের শোকরকারী। আল্লাহ তাকে মানোনীত করেছিলেন এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলেন।’ (সুরা নাহল: ১২০-১২১)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সুরা লোকমান: ১২)
প্রিয়নবী (স.) ছিলেন সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ। তাঁর আগের-পরের সব গুনাহ মাফ—সে কথা তিনি জানার পরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেই যেতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (স.) রাতে এত বেশি সালাত আদায় করতেন যে তার পদযুগল ফেটে যেত। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তবু আপনি কেন এত ইবাদত করছেন? তিনি বলেন, আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? (সহিহ বুখারি: ৪৮৩৭)
রাসুল (স.) জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নতুন নতুন পরিস্থিতিতে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন। ঘুম থেকে উঠে, খাবার গ্রহণ শেষে, জামা পরিধানের পর, সফর থেকে ফিরে এ রকম বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ওই বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন, যে বান্দা কিছু খেলে আল্লাহর প্রশংসা করে এবং কিছু পান করলেও আল্লাহর প্রশংসা করে। (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৪)
আরও পড়ুন: প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ৪০ দোয়া
সাহাবিদের তিনি কৃতজ্ঞ বান্দা হতে উৎসাহিত করতেন। রাসুলুল্লাহ (স.) একদিন প্রিয় সাহাবি মুয়াজ বিন জাবাল (রা.)-কে হাত ধরে বললেন, ‘মুয়াজ! আল্লাহর কসম আমি তোমাকে ভালোবাসি’। তখন মুয়াজ (রা.) বললেন, ‘আমার মা-বাবা আপনার জন্য কোরবান হোক, আমিও আল্লাহর কসম, আপনাকে ভালোবাসি’। এভাবে ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘মুয়াজ! আমি তোমাকে বলছি, কখনও নামাজের পরে এ দোয়াটি পড়তে ভুল করো না- اللّهُمَّ أَعِنِّيْ عَلٰى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ ‘হে আল্লাহ! আপনার জিকির, আপনার কৃতজ্ঞতা ও শোকর আদায় এবং সুন্দর করে আপনার ইবাদত করতে আপনি আমাকে সাহায্য করুন।’ (মুসনাদে আহমদ: ২২১১৯; আবু দাউদ: ১৫২৪)
দেখুন, হাদিসে ঘোষণা করা হচ্ছে, আল্লাহর জিকির ও সুন্দর ইবাদতের মতোই অনেক মূল্যবান একটি আমল আল্লাহর শুকরিয়া আদায়। একজন প্রকৃত মুমিনকে এই আমলের মর্যাদা বুঝতে হবে। মুমিনকে উপলব্ধি করতে হয় যে মহান আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামতে ডুবে আছে মানুষ। মহামূল্যবান জীবন, মেধা, জ্ঞান-বুদ্ধি, নাক, কান, চোখ, মুখ, জিহ্বা, হাত-পা, আলো, বাতাস, পানি, বসবাসের উপযুক্ত পৃথিবী না চাইতেই তিনি বান্দাকে দান করেছেন। সুখ-শান্তি, প্রয়োজনীয় রিজিক, সম্পদসহ অসংখ্য নেয়ামত তিনি ক্ষণে ক্ষণে বিলিয়ে যাচ্ছেন। তাই প্রতিনিয়ত মুমিনের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হওয়া উচিত ‘শোকর আলহামদুলিল্লাহ, সবই আল্লাহর দান’।
হজরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ তাআলা বলেছিলেন, ‘তোমার পরবর্তীতে আমি এক উম্মত পাঠাব, কাঙ্ক্ষিত কোনো বিষয় যদি তাদের হাসিল হয় তাহলে তারা আল্লাহর প্রশংসা করবে এবং শুকরিয়া আদায় করবে, আর যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু তাদের পেয়ে বসে তাহলে তারা সওয়াবের আশায় ধৈর্যধারণ করবে। (মুসনাদে আহমদ: ২৭৫৪৫; মুসতাদরাকে হাকেম: ১২৮৯; শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকি: ৪১৬৫; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ১৬৭০৪)
আরও পড়ুন: আলহামদুলিল্লাহ কেন সর্বোত্তম দোয়া
যারা যত বেশি আল্লাহর শুকরিয়া করেন, আল্লাহর কাছে তারা ততটাই দামী। কারণ আল্লাহ চান যে, বান্দা কৃতজ্ঞ হোক। অকৃতজ্ঞ হওয়া শয়তানের কাজ। শয়তান মানুষের চরম শত্রু। শয়তানের শত চেষ্টা থাকে মানুষকে অকৃতজ্ঞ বানাতে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘(শয়তান বলল) আমি মানুষের কাছে আসব ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে, ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওদের বেশির ভাগ কৃতজ্ঞ নয়।’ (সুরা আরাফ: ১৭)
আল্লাহর শুকরিয়া মুমিনের সফলতার সোপান। শুকরিয়া আদায়কারীদেরকে শুধু নেয়ামতের ওপরই রাখা হয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের (নেয়ামত) বাড়িয়ে দেবো, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয়ই আমার আজাব বড় কঠিন।’ (সুরা ইবরাহিম: ০৭)
প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো- সবসময় আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন, যে বান্দা কিছু খেলে আল্লাহর প্রশংসা করে এবং কিছু পান করলেও আল্লাহর প্রশংসা করে (অর্থাৎ আলহামদুলিল্লাহ) পড়ে।’ (মুসলিম: ২৭৩৪, তিরমিজি: ১৮১৬)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন, ‘অতএব, আল্লাহ তোমাদেরকে যেসব হালাল ও পবিত্র বস্তু দিয়েছেন, তা তোমরা আহার কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর যদি তোমরা তাঁরই ইবাদতকারী হয়ে থাকো।’ (সুরা নাহল: ১১৪)
এমনকি প্রিয়বস্তু হারানোর পরও আলহামদুলিল্লাহ বলতে উৎসাহিত করা হয়েছে মুমিনদের। এ ধরণের বান্দার জন্য জান্নাতে বিশেষ নেয়ামতের ঘোষণা দিয়ে মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো বান্দার সন্তান মারা যায়, তখন মহান আল্লাহ (জান কবজকারী) ফেরেশতাদের বলেন, ‘তোমরা আমার বান্দার সন্তানের প্রাণ হরণ করেছ কি? তারা বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তোমরা তার হৃদয়ের ফলকে হনন করেছ? তারা বলেন, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বলেন, ‘সেসময় আমার বান্দা কী বলেছে?’ তারা বলেন, ‘সে আপনার হামদ (প্রশংসা) করেছে ও ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রা-জিউন পাঠ করেছে।’ মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার (সন্তানহারা) বান্দার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি গৃহ নির্মাণ করো, আর তার নাম রাখো ‘বায়তুল হামদ’ (প্রশংসাভবন)।’ (তিরমিজি: ১০২১)
অসুস্থ ব্যক্তির আলহামদুলিল্লাহ বলা সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে এসেছে- মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমি আমার মুমিন বান্দাকে রোগাক্রান্ত করি, আর বান্দা সে অবস্থায় আমার প্রশংসা করে আলহামদুলিল্লাহ বলে; তবে সে বিছানা থেকে এমনভাবে ওঠে দাঁড়ায়; যেন তার মা তাকে ভূমিষ্ঠকালে যেমন জন্মদান করেছিল।’ (হাদিসে কুদসি)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।