ধর্ম ডেস্ক
১৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:২৫ পিএম
পবিত্র কোরআনে গিবত বা পরনিন্দাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করবে।’ (সুরা হুজরাত: ১২)
ইসলাম মানুষের সম্মান, মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তবে মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতি প্রতিরোধের প্রয়োজন হলে ইসলামি শরিয়ত কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কারো দোষ বা ত্রুটি উল্লেখের অনুমতি দিয়েছে।
ইমাম নববি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘রিয়াদুস সালেহিন’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ৬টি বিষয়ে গিবত জায়েজ হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হতে হবে সংশোধন, সতর্কতা বা অধিকার রক্ষা। ব্যক্তিগত আক্রোশ, অপমান বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা করা যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর হাদিসে গিবতের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো গিবত কী?’ সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বলেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি তার মধ্যে থাকে? তিনি বলেন, ‘তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, সেটিই গিবত। আর যদি না থাকে, তাহলে তা অপবাদ।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৭)
ইমাম নববি (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী গিবত জায়েজ হওয়ার ক্ষেত্রগুলো হলো-
কেউ জুলুম বা অন্যায়ের শিকার হলে তা বিচারক বা এমন ব্যক্তির কাছে তুলে ধরা জায়েজ, যিনি সেই অন্যায় প্রতিহত করতে পারেন। এর উদ্দেশ্য হবে নিজের অধিকার রক্ষা করা এবং জুলুম বন্ধ করা।
আরও পড়ুন: গিবতের কাফফারা কী?
কেউ কোনো গুনাহ বা ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত হলে তা বন্ধ করার জন্য দায়িত্বশীল বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে বিষয়টি জানানো জায়েজ। এর উদ্দেশ্য হবে সংশোধন করা এবং সমাজের ক্ষতি প্রতিরোধ করা।
কোনো জটিল সমস্যার ধর্মীয় সমাধান জানতে আলেম বা মুফতির কাছে ঘটনার বিবরণ দেওয়া জায়েজ। যেমন, কেউ পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান জানতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো ত্রুটি উল্লেখ করলে তা গিবতের মধ্যে গণ্য হবে না।
মানুষকে প্রতারণা বা ক্ষতি থেকে বাঁচাতে প্রয়োজন অনুযায়ী কারো ত্রুটি বা ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা জায়েজ হতে পারে। বর্তমান সময়ে এটি কয়েকটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ-
বিয়ের প্রস্তাব: কোনো পাত্র বা পাত্রী সম্পর্কে এমন কোনো তথ্য জানা থাকলে, যা ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনে ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা জানানো আমানত। এটি গিবত নয়, এটি একটি দায়িত্ব।
ব্যবসায়িক লেনদেন: কোনো ব্যক্তি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত হলে তার বিষয়ে অন্যকে সতর্ক করা যাবে, যাতে সে ক্ষতির শিকার না হয়।
দ্বীনি বিষয়ে বিভ্রান্তি: কেউ হাদিস বা দ্বীনি বিষয়ে ভুল তথ্য প্রচার করলে মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচাতে তার ভুল তুলে ধরা যেতে পারে।
আরও পড়ুন: মেরাজে নবীজির দেখা কিছু পাপের ভয়ঙ্কর শাস্তি
কেউ যদি প্রকাশ্যে শরিয়তবিরোধী বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকে, তাহলে মানুষকে বিভ্রান্তি ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তার সেই প্রকাশ্য কাজের কথা বলা জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, সে যে গুনাহ প্রকাশ্যে করে শুধু সেটুকুই উল্লেখ করা যাবে। তার ব্যক্তিগত জীবনের গোপন কোনো দোষ অনুসন্ধান করা বা প্রচার করা বৈধ নয়।
কারো পরিচয় বোঝানোর জন্য এমন কোনো বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা, যা ছাড়া তাকে চেনা সম্ভব নয়, তা গিবতের মধ্যে গণ্য হবে না। তবে তা অবশ্যই পরিচয়ের প্রয়োজনেই হতে হবে, অপমান বা উপহাসের উদ্দেশ্যে নয়। সম্মানজনক অন্য কোনো উপায়ে পরিচয় দেওয়া সম্ভব হলে সেটিই ব্যবহার করা উত্তম।
অনুমোদিত ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি-
একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিজের জবান বা জিহ্বার হেফাজত করা। কথা বলার আগে চিন্তা করা উচিত- এই কথা কি কারো উপকার করবে, নাকি শুধু তার সম্মান ক্ষুণ্ন করবে? গিবত করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অন্যের গিবত শোনাও অনুচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গিবত থেকে বেঁচে থাকার এবং মানুষের সম্মান রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৭; রিয়াদুস সালেহিন; সুরা হুজরাত: ১২; তাফসিরে রুহুল মাআনি: ১৪/২৪২; সুরা হুমাজাহ: ১