০৫ মে ২০২৬, ১১:৪৮ এএম
কাস্তেলো ব্রাঙ্কো জেলার ইদানহা-আ-নোভা মিউনিসিপ্যালিটির একটি গ্রাম পাহাড়ের উপরে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে গাড়ি যখন এঁকেবেঁকে উপরে উঠতে থাকে, তখন হঠাৎ মনে হয় কেউ যেন সময়ের হাতল ধরে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে দিয়েছে।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে কিছু নেই। শুধু বিশাল বিশাল ধূসর পাথরের স্তূপ। কিন্তু একটু কাছে গেলেই চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। পাথরের খাঁজে খাঁজে ঘর, গলি, জানালা। একটি পুরো গ্রাম লুকিয়ে আছে সেখানে। এই গ্রামের নাম মোনসান্তু।
১৯৩৮ সালে সরকার-প্রায়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় পর্তুগালের বারোটি ঐতিহাসিক গ্রামকে তাদের নিজ নিজ প্রদেশের ‘সবচেয়ে পর্তুগিজ গ্রাম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই প্রতিযোগিতায় মোনসান্তু জনমানসে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘পর্তুগালের সবচেয়ে পর্তুগিজ গ্রাম’ (A Aldeia Mais Portuguesa de Portugal) নামে।
মোনসান্তু পর্তুগালের কাস্তেলো ব্রাঙ্কো জেলার (ইদানহা-আ-নোভা মিউনিসিপ্যালিটির অন্তর্গত একটি গ্রাম। পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, স্পেনের সীমান্তের কাছাকাছি এই গ্রামটির অবস্থান। গ্রামটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৫৮ মিটার উচ্চতায় একটি গ্রানাইট পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।

২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, মোনসান্তু এলাকার আয়তন ১৩১.৭৬ বর্গ কিলোমিটার এবং তৎকালীন জনসংখ্যা ছিল ৮২৮ জন। মোনসান্তুর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এখানকার ঘরবাড়িগুলো পাথরের ওপর আলাদা করে নির্মিত নয়। বরং পাহাড়ের বিশাল গ্রানাইট বোল্ডারগুলোকেই দেয়াল বা ছাদ হিসেবে ব্যবহার করে কোনো দুঃসাহসী স্থপতি এক অনন্য স্থাপত্যের জন্ম দিয়েছে।
মোনসান্তুর ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলে, আদিম প্রস্তর যুগ থেকেই এই পাহাড়ে মানুষের বসবাস। রোমানরাও এখানে তাদের চিহ্ন রেখে গেছে। কিন্তু মোনসান্তুর প্রকৃত ইতিহাস শুরু হয় মধ্যযুগে।
দ্বাদশ শতাব্দীতে পর্তুগালের প্রতিষ্ঠাতা রাজা প্রথম আফনসো এনরিকেস দীর্ঘ রেকনকিস্তা যুদ্ধের মাধ্যমে এই এলাকাটি মুসলমানদের কাছ থেকে উদ্ধার করেন। এরপর তিনি এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়চূড়াটি টেম্পলার নাইটদের হাতে তুলে দেন। সেই বীর নাইটরা পাহাড়ের চূড়ায় একটি শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেন কাস্তেলো দ্য মোনসান্তু। সেই দুর্গ আজও পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, বহু শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।
মোনসান্তুর সাহসিকতার একটি অবিস্মরণীয় লোককথা আছে। একবার শত্রুসেনা টানা এক বছর ধরে গ্রামটি অবরোধ করে রেখেছিল। খাবার ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু আত্মসমর্পণের প্রশ্নই নেই। এমন সময় গ্রামের বুদ্ধিমান মানুষেরা একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের শেষ গরুটিকে ভালো করে খাইয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে শত্রু শিবিরের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হলো। শত্রুসেনারা অবাক — যাদের কাছে পশুকে খাওয়ানোর মতো এত প্রচুর রসদ আছে, তাদের হারানো কি সম্ভব? পরাজয়ের ভয়ে শত্রুরা অবরোধ তুলে চলে গেল।
সেই অসামান্য বুদ্ধিমত্তার স্মরণে আজও প্রতি বছর মে মাসে মোনসান্তুর মহিলারা পাহাড়ের চূড়া থেকে ফুলে ভরা মাটির হাঁড়ি ছুঁড়ে দেন। এই উৎসবের নাম ‘মেন্দো গুয়েরো’ বা ‘ইম্পেরিও দ্য মোনসান্তু’ গ্রামের বীরত্বের বার্ষিক উদযাপন।
আজকের মোনসান্তুতে পা দিলে মনে হয় কোনো ফ্যান্টাসি উপন্যাসের পাতায় ঢুকে পড়েছেন। সরু গলিপথ, মাথার উপর কয়েক টন ওজনের গ্রানাইট ছাদ, দুটো পাথরের ফাঁকে ফুলের টব রাখা। এই দৃশ্যগুলো চোখকে বারবার অবাক করে।

স্থাপত্যের দিক থেকে প্রতিটি বাঁকে ম্যানুয়েলিন স্টাইলের দরজার কারুকাজ এবং পাথরের গায়ে খোদাই করা প্রাচীন চিহ্ন আজও অক্ষত। স্থানীয় কারুশিল্পের এক অদ্ভুত নিদর্শন হলো কাপড়ের তৈরি মুখহীন পুতুল ‘মারাফোনা’।
স্থানীয় বিশ্বাস, এই পুতুল বাড়িতে সৌভাগ্য বয়ে আনে এবং বজ্রপাত থেকে রক্ষা করে। পাহাড়চূড়ার দুর্গ কাস্তেলো দ্য মোনসান্তু এখন একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। দুর্গের ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে দিগন্তবিস্তৃত পর্তুগিজ সমভূমির দৃশ্য দেখা এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। গ্রামের বাসিন্দারা এখনো তাদের পূর্বপুরুষের মতো পাথরের ঘরে বাস করেন। পর্যটন বাড়লেও গ্রামের মূল চরিত্র অটুট রয়েছে।
মোনসান্তুতে কয়েকটি ছোট গেস্ট হাউস আছে যেগুলো সরাসরি পাহাড়ের পাথরের ভেতরে তৈরি। এক রাত সেখানে থাকা জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারে। বসন্তকাল, বিশেষত মে মাস সবচেয়ে আদর্শ সময়। ফুল ফোটার মৌসুম এবং বার্ষিক উৎসবের কাল।
মোনসান্তু কেবল একটি গ্রাম নয়। এটি মানুষের টিকে থাকার লড়াই, প্রকৃতির সাথে মিতালি এবং একটি জাতির পরিচয়ের শ্রেষ্ঠ দলিল। পাথরের বুকে যে এমন কোমল প্রাণের স্পন্দন থাকতে পারে, তা মোনসান্তু না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
সিএএমআইকে/এআরএম