images

রাজনীতি

জামায়াত নিয়ে টুকুর বক্তব্যে বিএনপিতে অস্বস্তি

মো. ইলিয়াস

০২ অক্টোবর ২০২২, ১০:৫৫ এএম

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ডান-বাম ঘরানার দলগুলোকে এক সূত্রে গেঁথে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করতে চায় বিএনপি। এরইমধ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে নিয়মিতই সভা-সমাবেশের মাধ্যমে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠছে রাজনৈতিক দলগুলো। এমন সময় জামায়াত নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বিরূপ মন্তব্য খোদ দলটির মধ্যেই অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগের পরকীয়া প্রেম চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। রাজধানীর হাজারীবাগে সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন মাঠে এক সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সমাবেশে তিনি সরকারের বিভিন্ন সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। একপর্যায়ে তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, আওয়ামী লীগের মুখে প্রায়ই শুনি, যেটা বুলি হয়ে গেছে। তারা প্রায়ই বলে, বিএনপি-জামায়াত, বিএনপি-জামায়াত। আমি বলছি, এখন সময় এসেছে আওয়ামী-জামায়াত, আওয়ামী–জামায়াত বলার। জামায়াতও উর্দু, আওয়ামী লীগও উর্দু-দুটো একসঙ্গে মিলবে ভালো। ওরা (আওয়ামী লীগ) জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে, কিন্তু বেআইনি ঘোষণা করে না। তাহলে কি আমি বলব, উনাদের পরকীয়া প্রেম চলছে!

tuku

জামায়াত নিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এমন মন্তব্যের বিষয়ে বিএনপি'র শীর্ষ কোনো নেতা কথা বলছেন না। এ নিয়ে দলের ভেতরে এবং বাইরে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। টুকুর এই বক্তব্যের পরদিন প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। এমন অবস্থায় বিএনপি’র নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখা এই নেতা অনেকটাই বেকায়দায় পড়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

সূত্র জানায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এমন বক্তব্যের পরে বিএনপির মধ্যে একটি অংশ তার ব্যাপক সমালোচনা করছেন। দলটি যখন যুগপৎ আন্দোলনের কথা ভাবছে, সারাদেশে আন্দোলন চলমান রয়েছে এমন সময় বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটের শরিক জামায়াতকে নিয়ে টুকুর এমন বক্তব্য সমীচীন হয়নি বলে তারা মনে করেন। কারণ টুকুর এমন বক্তব্যে যুগপৎ আন্দোলনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এমনকি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান টুকুর এমন বক্তব্যের কারণ জানতে চেয়েছেন।

আরও পড়ুন: জোট ত্যাগের ঘোষণা নিয়ে কী বলছে বিএনপি-জামায়াত

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এই বক্তব্যের পরদিন প্রতিবাদ জানায় জামায়াত। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বিবৃতিতে বলেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত যে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন, তা দেশবাসীকে বিস্মিত করেছে। এটি কোনও রাজনীতিবিদের ভাষা হতে পারে না। তার এ বক্তব্য স্বৈরাচারী শাসনকে প্রলম্বিত করার ক্ষেত্র তৈরি করবে।

আবদুল হালিম এটাও উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামী কখনও কোনও আপস, গোপন ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না এবং করার প্রশ্নই আসে না।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অনলাইনে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিএনপি জোটের সঙ্গে তারা আর নেই। এরপর এখন টুকুর বক্তব্যে বিএনপির সাথে জামায়াতের প্রায় দুই যুগের সন্ধি ভাঙার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। অনেকে এটিকে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি বলে প্রচার করেন। সম্প্রতি এই দূরত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও বলা হচ্ছে জোটগত ঐক্য না থাকলেও আগামী নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলন করবে উভয় দল।

bnp-jamat

জামায়াতে ইসলামীর বিবৃতির পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গণমাধ্যমকে বলেছেন, সোমবার রাজধানীর হাজারীবাগে বিএনপি সমাবেশে আমার পুরো বক্তব্য ছিল আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে, জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে নয়। আমি জামায়াত নিয়ে কিছু বলিনি। বরং তাদের সাপোর্ট করেছি। এ নিয়ে জামায়াত বিবৃতি দিয়ে তারা অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে।

আরও পড়ুন: জামায়াত আমিরের বিএনপি ‘ছাড়ার’ ঘোষণায় তোলপাড়

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ ঢাকা মেইলকে বলেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যে বক্তব্য দিয়েছেন এর প্রতিবাদে আমরা বিবৃতি দিয়েছি। তার এমন বক্তব্য শিষ্টাচার বহির্ভূত। তিনি অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন।

জামায়াত নিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য বলতে পারব না। এ বিষয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সাথে কথা বললে জানতে পারবেন।

jamat

নাম‌ প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির আরেকজন ভাইস চেয়ারম্যান জানান, যেহেতু ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতে ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে যায়নি এবং আমরাও ২০ দলীয় জোট বাতিল করিনি। তাই এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গী জামায়াতকে নিয়ে এমন মন্তব্য না করলে ভালো হতো। স্বাভাবিক কারণে বিএনপির মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জামায়াত তো ২০ দলের মধ্যে অন্যতম একটি, দল একেবারে ছোট দল নয়। তাই তাদেরকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করার আগে সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা উচিত। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জামায়াত নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন এটা তার ব্যক্তিগত মতামত। প্রতিটা লোকের ব্যক্তিগত মতামত নিয়ে বক্তব্য থাকতেই পারে। তার এই বক্তব্য নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর জামায়াত নিয়ে বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, টুকুর বক্তব্যের বিষয়ে আমি কিছু বলব না। 

এমই/এএস