Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

সমঝোতা হয়নি, স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে জামায়াত-এনসিপির দূরত্ব বাড়ছে

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম

  • এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় জামায়াত
  • নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি এনসিপির
  • ঢাকার অন্তত একটি সিটিতে আসিফ মাহমুদকে সমর্থন চায় এনসিপি
  • কুমিল্লাসহ দুটি সিটিতে ছাড় দেওয়ার আগ্রহ জামায়াতের
  • লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি ঘিরে সমালোচনা
  • জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ দুই দলের

জাতীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে একসঙ্গে পথ চললেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি ১১ দলীয় ঐক্যের প্রধান দুই শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় জামায়াত। অন্যদিকে, জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক হিসেবে নির্বাচনে আসন সমঝোতার প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় নিজস্ব শক্তিতে নির্বাচনী মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি। দুই দলের মধ্যে প্রার্থী ছাড় ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে এনসিপির একাংশের অসন্তোষ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ধরন—সব মিলিয়ে জোটের দুই প্রধান শরিকের সম্পর্কে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

তবে স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে জোট ভাঙনের লক্ষণ হিসেবে দেখছে না কোনো পক্ষই। উভয় দলের নেতারা বলছেন, জাতীয় সংসদ ও রাজপথে ১১ দলীয় ঐক্য অটুট থাকবে। সংস্কার বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ এবং গণহত্যার বিচারের মতো অভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে সমঝোতার প্রশ্নে আপাতত বরফ গলার লক্ষণ নেই। ফলে নির্বাচনের মাঠে দুই দলের আলাদা অবস্থান জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটিতে আলোচনা শুরু হলে এনসিপিসহ কয়েকটি দল জোটগতভাবে অথবা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। বিশেষ করে ঢাকার অন্তত একটি সিটি করপোরেশনে এনসিপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখানো হয়। এ নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগও করে এনসিপির সর্বোচ্চ ফোরামের একটি প্রতিনিধি দল। তবে জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হয়নি।

সূত্রের দাবি, ঢাকার অন্তত একটি সিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে সমর্থন দেওয়ার দাবি জানায় এনসিপি। কিন্তু জামায়াত সেই দাবি মেনে নেয়নি। যদিও কুমিল্লাসহ দুটি সিটি করপোরেশনে এনসিপিকে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহ ছিল বলে জানা গেছে। তবে কোন এলাকায় কে প্রার্থী দেবে, কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে এবং সমঝোতার ভিত্তি কী হবে—এসব বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলোকে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

জামায়াতের যুক্তি, অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিক দলগুলো আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। এবারও সেই রাজনৈতিক রীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে কোনো এলাকায় কোনো দলের প্রার্থী না থাকলে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা হলে তাতে বাধা নেই। অন্যদিকে, এনসিপির নেতাদের একাংশ মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সাংগঠনিক সহযোগিতা ও সমর্থন পেয়ে দলটির প্রার্থীরা ভালো ফল করেছিলেন। স্থানীয় নির্বাচনেও একই ধরনের সহযোগিতা বা সমর্থন পেলে ভালো ফল করার সুযোগ ছিল। এ কারণে জোটের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী ছিল দলটি।

জামায়াতের অনাগ্রহের পেছনে সাংগঠনিক বাস্তবতাও কাজ করছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, জাতীয় নির্বাচনে জোটের স্বার্থে আসন ছাড় দিতে গিয়ে তৃণমূলে দলটির মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেক ত্যাগী ও দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া প্রার্থীকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একইভাবে আসন ছাড় দিতে হলে সাংগঠনিক জটিলতা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দলীয়ভাবে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে তৃণমূলের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনী সক্ষমতা যাচাইয়ের লক্ষ্যেই এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতের হাইকমান্ড।

অন্যদিকে, এনসিপি নেতাদের যুক্তি, জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ায় দলটির নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিলে সারা দেশে দলের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে। এ কারণে সমঝোতা না হলেও স্থানীয় নির্বাচনে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে না দলটি।

স্থানীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা না হওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও এনসিপির মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। দলটির একাংশের অভিযোগ, সংসদে বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও জামায়াতে ইসলামী সরকারি দল বিএনপির সঙ্গে আপসকামী কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। সরকার বা সরকারি দলের জনবিরোধী বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের বক্তব্য ও কর্মসূচিতে প্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেখা যাচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শক্ত ও জোরালো অবস্থান না নিয়ে দলটি নমনীয়তা বা শৈথিল্য দেখাচ্ছে বলে মনে করেন এনসিপির কিছু নেতা।

তবে জামায়াতের অবস্থান ভিন্ন। দলের নেতারা বলছেন, সংসদে বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করাই তাঁদের লক্ষ্য। ন্যায়সংগত বিষয়ে সহযোগিতা এবং অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ—এই নীতিতেই তাঁরা এগোচ্ছেন। সরকারের সঙ্গে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, বরং জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা রাখাই তাঁদের রাজনৈতিক কৌশল। এ অবস্থানকে এনসিপির একাংশের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হচ্ছে না। ফলে দুই দলের রাজনৈতিক কৌশলেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি দলের কয়েকজন নেতার বক্তব্যেও এই অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত শনিবার যশোরে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমাবেশে জামায়াত নেতাদের উপস্থিতিতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ওঠার পরও পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপি প্রার্থীর সৌজন্য বিনিময়ের সমালোচনা করেন তিনি। যদিও ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে গত শনিবার ঠাকুরগাঁওয়ে এবং রোববার ঢাকায় বিক্ষোভ করে জামায়াত।

এনসিপির নেতাদের একাংশ মনে করেন, বিরোধী দলের রাজনীতিতে আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকার ও সরকারি দলের বিরুদ্ধে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আন্দোলন-সংগ্রাম জোরদার করা উচিত। অন্যদিকে, জামায়াতের নেতারা মনে করেন, সংসদীয় রাজনীতিতে গঠনমূলক বিরোধিতার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী রাজপথে কর্মসূচি পালন করাই দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভূমিকা। দুই দলের এই কৌশলগত পার্থক্য স্থানীয় নির্বাচনের সমঝোতা নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

লংমার্চে অনুপস্থিতি ঘিরে আলোচনায় দূরত্ব

১১ দলীয় ঐক্যের সাম্প্রতিক লংমার্চেও দুই দলের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। গত শনিবার ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ামুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের কেউ অংশ নেননি। এর আগে জোটের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও রংপুরমুখী দুটি লংমার্চে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। এবার তার ব্যতিক্রম হওয়ায় দুই দলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

তবে উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত না থাকলেও লংমার্চের বহরে দলটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আব্দুল হান্নান মাসউদ, যুগ্ম সদস্যসচিব এসএম সাইফ মুস্তাফিজ ও ফরিদুল হক এবং খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরিন ইসা। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও কর্মসূচিতে যুক্ত হন।

লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে অনুপস্থিতির বিষয়ে জামায়াতকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তবে পরবর্তী সমাবেশগুলোতে এনসিপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান তিনি। এনসিপির পক্ষ থেকেও জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে একটি কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিকে জোট থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে না দুই পক্ষ।

জোটে ভাঙন দেখছে না জামায়াত ও শরিকরা

জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের মাধ্যমে জামায়াত ৬৮টি, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়ী হয়। নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসনে আরও ১৩টি আসন যুক্ত হয়। এর মধ্যে জামায়াতের নয়টি, এনসিপির দুটি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জাগপার একটি করে আসন রয়েছে। বর্তমানে সংসদে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করছেন।

সংসদে বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে ১১ দলীয় ঐক্য। সংস্কার বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়, জুলাই সনদ ও গণহত্যার বিচারের মতো ইস্যুতে শরিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। তবে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট মতপার্থক্য এবং জামায়াতের বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে এনসিপির একাংশের অসন্তোষের কারণে দুই দলের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

এ বিষয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অতীতে জামায়াত যখন বিএনপির সঙ্গে জোট করে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, সরকারে অংশীদার হয়েছে কিংবা রাজপথের আন্দোলনে শরিক হয়েছে, তখনো স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলগুলো আলাদাভাবে অংশ নিয়েছে। দেশের জোটগত রাজনীতির ইতিহাসে এমন রীতিই চলে আসছে। এবারও সে অনুযায়ী স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো এলাকায় কোনো দলের প্রার্থী না থাকলে কিংবা স্থানীয়ভাবে সমঝোতা হলে তাতে বাধা নেই। স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার কারণে ১১ দলীয় ঐক্য কিংবা জামায়াত-এনসিপির সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই ঐক্য অটুট থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধানও জোটে ভাঙনের আশঙ্কা দেখছেন না। তিনি বলেন, লিয়াজোঁ কমিটির আলোচনার পর শীর্ষ নেতারা স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর অর্থ জোটে ভাঙন নয়। গত ২৭ অক্টোবর ১১ দলের বৈঠক শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও একই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন।

জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ এনসিপির

জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলেও ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, স্থানীয় নির্বাচন, বিরোধী দলের ভূমিকা কিংবা রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচারের মতো অভিন্ন ইস্যুতে জোটের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে জোটে থাকলেও নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য বজায় রাখবে এনসিপি। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, এনসিপি ১১ দলীয় ঐক্যেই আছে। জোট ভাঙার গুঞ্জনের কোনো ভিত্তি নেই। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী জোট ভাঙার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গত রোববার এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচারের প্রশ্নে জোটে কোনো দূরত্ব নেই। তাঁরা ঐক্যবদ্ধ আছেন। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য একটি সম্প্রসারিত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে। দ্রুত এই কমিটি মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে।

তবে জোটের শরিক হলেও এনসিপি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখবে জানিয়ে তিনি বলেন, দলটির নিজস্ব রাজনীতি ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। জোটে থাকলেও অন্য কোনো দলের নেতাদের সব বিষয়ে সমর্থন দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাঁরা অনুসরণ করবেন না। সরকার কিংবা বিরোধী দলের কেউ ভুল করলে তার জবাবদিহি চাইবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো জোটের রাজনীতি করি না, কোনো বিরোধী দলের রাজনীতিও করি না।’

নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনী মাঠে দুই দল

সমঝোতা না হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলই নিজস্ব প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। জামায়াত ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ অনেকটা এগিয়ে নিয়েছে। গত ৪ অক্টোবর রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে সাদিক কায়েমকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচনেও সৎ, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, গত ২৯ মার্চ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছিল এনসিপি। পরে ঢাকার দুই সিটিতে প্রার্থী পরিবর্তন করে দলটি। গত ৩০ অক্টোবর দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নতুন প্রার্থী ঘোষণা করেন। এতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। প্রার্থী পরিবর্তনের পর দুই সিটিতে তাঁদের পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতারা সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

শুক্রবার এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যেও স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার কথা জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে আমরা এককভাবে অংশগ্রহণ করব। এ জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে এনসিপি সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।’

এনসিপির নেতারা মনে করছেন, এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থনের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। একই সঙ্গে সারা দেশে দলীয় ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, জামায়াতের লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায়ে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও প্রার্থীদের অবস্থান সুসংহত করা।

সব মিলিয়ে জাতীয় নির্বাচনে একসঙ্গে লড়াই করে সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান নিশ্চিত করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে জামায়াত ও এনসিপি এখন ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে। একদিকে জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়, অন্যদিকে সমঝোতার আশা ছেড়ে নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামছে এনসিপি। তবে দুই দলের নেতারা জোট অটুট থাকার কথা বললেও স্থানীয় নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য এবং রাজনৈতিক কৌশলের এই ব্যবধান ভবিষ্যতে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয় কতটা কার্যকর থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

টিএই/এআর