জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) মেয়াদ বাতিলের সিদ্ধান্ত সাত দিনের মাথায় পরিবর্তন করে তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখার কড়া সমালোচনা করেছেন সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ।
এই ঘটনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিচালনায় দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন হাসনাত।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকের আগে জমা দেওয়া এক আলোচনা পত্রে এ দাবি জানান তিনি। বৃহস্পতিবার জমা দেওয়া সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বহাল থাকায় ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ-বদলিতে অনিশ্চয়তা এবং জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আলোচনা পত্রে সোনালী ব্যাংকের এমডির ঘটনাকে প্রশাসনিক অসংগতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গত ১৯ অক্টোবর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে। কিন্তু সাতদিন পরই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখা হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যাংক পরিচালনায় বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করেন এই সংসদ সদস্য।
এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা এনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি। সাউথইস্ট ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জনতা ব্যাংকের এমডি এবং যমুনা ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি করার ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নিয়োগের মানদণ্ড স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর প্রস্তাব, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডি নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সরকারি ব্যাংকারদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে শীর্ষ নির্বাহী নির্বাচন করতে হবে।
আলোচনা পত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের চিত্রও তুলে ধরা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি, ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। যা ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৫১ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের ২৯ হাজার ২৯ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ১৩১ কোটি এবং বিডিবিএলের ৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।
আলোচনা পত্রে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণের পেছনে বেক্সিমকো, এস আলম গ্রুপ, অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্টের মতো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ অনিয়মের ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার কারণে এসব অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন সংসদ সদস্য।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তদারকির দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মেয়াদ ও অপসারণের বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট করার কথা বলেছেন, যাতে নির্বাহী বিভাগ ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, পরিচালনা পর্ষদের জন্য মূল কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই) চালু এবং ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আলাদা করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আলোচনা পত্রে আরও বলা হয়, নির্বাচনের আগে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন সংসদ সদস্য।
তাঁর মতে, ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তন জরুরি।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ৬ জানুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গঠন করা হয়। আলোচনা পত্রে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলেরও ব্যাংক খাতে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ দূর করার পক্ষে অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়েও ব্যাংকারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
টিএই/এএম