Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

গণভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের রায় না মেনে সরকার গাদ্দারি করেছে: মামুনুল হক

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, ‘গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থনে রাষ্ট্র সংস্কারের যে গণরায় এসেছে, তা কার্যকর না করে সরকার জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে।’

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আড়াইহাজার থানা শাখার উদ্যোগে গণভোটের গণরায় কার্যকর ও নাগরিক সংকট সমাধানের দাবিতে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে সংবিধান সংশোধনের নামে দুর্বল পরিবর্তন নয়, বরং জুলাই সনদের আলোকে স্থায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার ছিল বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার অন্যতম প্রধান দাবি। সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার করেই তারা জনগণের ভোট ও রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করেছিল। অথচ এখন সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে ‘

তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কার এক বিষয় নয়। সংশোধনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পরিবর্তন আনা হলেও তা পরবর্তী সময়ে আদালত বা নতুন সরকারের মাধ্যমে বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন স্থায়ী ও কাঠামোগত সংস্কার।’

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর ৩৩টি রাজনৈতিক দল দীর্ঘ নয় মাসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ৮৩টি অধিবেশনে অংশ নিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। সেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন ও গণভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ নির্বাচন ছিল সরকার গঠনের নির্বাচন, আর গণভোট ছিল রাষ্ট্র মেরামতের নির্বাচন। জনগণের গণরায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও এর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল।’

তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করেননি। এর মাধ্যমে গণভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে দেওয়া জনগণের রায়কে উপেক্ষা করা হয়েছে। সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের পথে এগিয়ে আসে, তাহলে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু জনগণের ভোটাধিকার ও গণরায়কে অবজ্ঞা করা হলে অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’

মামুনুল হক বলেন, ‘জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার করা হলে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এককভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকার সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং প্রশাসন ও পুলিশকে দলীয়করণমুক্ত করতে হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী। আড়াইহাজার থানা শাখার নাগরিক সমাবেশের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হলেও একজন সংসদ সদস্যের নির্দেশে প্রশাসন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।’

এ সময় রাজনৈতিক বৈষম্য অব্যাহত থাকলে দেশে আবারও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও গণবিপ্লবের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

দেশের অর্থনৈতিক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে সংকটের মুখে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অথচ উৎপাদন ব্যয় কমছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ খাতকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে কার্যকর সংস্কার জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কারও সঙ্গে আপস করবে না।’

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের ওপর নেতাগিরি করবেন না; বরং জনগণের সেবা ও খেদমত করবেন। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তারা ভূমিকা রাখবেন।’

সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা তোফাজ্জল হুসাইন মিয়াজি, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মাওলানা উবায়দুল কাদের নদবী প্রমুখ। এতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারায়ণগঞ্জ জেলা ও আড়াইহাজার থানা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় জনগণ উপস্থিত ছিলেন।

এএম