Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

পিএসসি সংস্কারসহ ১৩ দফা দাবি ছাত্রশিবিরের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাঠামোগত সংস্কার, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটি পিএসসিকে তিনটি পৃথক কমিশনে পুনর্গঠন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।

লিখিত বক্তব্যে নূরুল ইসলাম বলেন, ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করাই ছিল অভ্যুত্থানের অন্যতম দাবি। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পিএসসিসহ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা, নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে চাকরিপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ উঠছে।

তিনি বলেন, গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে সরকার জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিচ্ছে না। পিএসসি, ইউজিসি, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা, মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে মেধাবীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

পিএসসিকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে জুলাই জাতীয় সনদে বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠন করে সংবিধানের অধীনে তিনটি পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানান নূরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এসব কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাইয়ে সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন এবং কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রত্যেক কমিশনের একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁদের পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে। অথচ সরকার এখন পর্যন্ত এসব সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন পিএসসি কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করে সেগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবি জানানো হয়। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে পরিচয় গোপন রেখে কোডভিত্তিক লিখিত খাতা মূল্যায়ন, একই খাতার বিভিন্ন প্রশ্ন পৃথক পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা, মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ পদ্ধতি চালু, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তায় নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস ও প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি।

তবে এসব সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করেছেন। পরবর্তী সময়ে কমিশনের দুই সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমানের পদত্যাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর চায়ের আমন্ত্রণের পর কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনরায় ১০০ থেকে ২০০ করার উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। লিখিত বক্তব্যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি প্রার্থীকে নিয়োগপত্র না দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, বাদ পড়া প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড বা নিয়োগ না দেওয়ার যৌক্তিক কারণ জানানো হয়নি বলে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে চাকরিপ্রার্থীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ ধরনের বৈষম্য সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতার পরিপন্থী।

সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধা ও যোগ্যতার গুরুত্ব কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর বরাদ্দ করা হলে দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়বে। নতুন বিধিমালায় বিভিন্ন গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের অনুপাত পরিবর্তনের উদ্যোগও উদ্বেগজনক।

এ ছাড়া ৪৫তম বিসিএসের গেজেটে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ১ হাজার ৮০৭ জনের মধ্যে ৫৬ জন এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের গেজেটে প্রথম দফায় ৫৭ জন প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ ছাড়া সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বাদ দেওয়া তাঁদের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের মুখে পুনঃযাচাই ও কয়েকজনের গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্য নয়।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ১৩ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—জুলাই সনদ অনুযায়ী পিএসসির কাঠামোগত সংস্কার ও চেয়ারম্যান-সদস্য নিয়োগে স্বচ্ছ বাছাই কমিটি গঠন; নবম ও দশম গ্রেডের সব সরকারি চাকরির নিয়োগ পিএসসির অধীনে আনা; নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা; মোনেম কমিশনের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগ বহাল রাখা এবং মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর শূন্য পদ ও জনবল চাহিদার তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ।

এ ছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে প্রার্থীদের প্রতি বৈষম্য বন্ধ, পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য ও মানদণ্ড প্রকাশ, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অপরাধসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন এবং নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে প্রার্থীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর পদের ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ; মৌখিক পরীক্ষার অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি; ভাইভায় অস্বাভাবিক নম্বর প্রদান পর্যালোচনায় অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ; প্রশ্নফাঁস ও প্রক্সি পরীক্ষা প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধান পর্যালোচনা করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও মূল্যায়নে মেধা, সততা, দক্ষতা ও কর্মসম্পাদনকে গুরুত্ব দেওয়া।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক সুমন সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান এবং ঢাকা কলেজ শাখার সভাপতি মোস্কাকিম আহমেদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

টিএই/এএম