Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে আ.লীগের ইন্ধন!

নিজস্ব প্রতিবেদক

০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর তৎপরতা। এই আন্দোলনে দলটির নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ, সংঘর্ষে উসকানি ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের এই তৎপরতার সমন্বয় করছেন ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের এনে আন্দোলনে যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

রোববার (১ নভেম্বর) ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান ১১ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানান। তিনি বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে দুজনের নাম রাকিব ও আরিফ বলে জানা গেছে। বাকিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

ডিবির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, আলিফ মোল্লাহ বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে শতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতির তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।

মিরপুর বিভাগের পুলিশের পক্ষ থেকে আরও ১৭ জনকে আটকের কথা জানিয়েছেন উপপুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার। তার দাবি, আটক ব্যক্তিরা নাশকতার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

আরও পড়ুন

শ্রমিক আন্দোলন: সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি

মিরপুরের শ্রমিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের পদধারী নেতার অংশগ্রহণের তথ্যও সামনে এসেছে। তার নাম সাজবুল ইসলাম। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

রোববার সকাল থেকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শ্রমিক আন্দোলনের একাধিক ছবি প্রকাশ করে এতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সাজবুল। তার ফেসবুক পরিচিতিতেও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পদটির উল্লেখ রয়েছে। একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজেও একজন শ্রমিক।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একাধিক ফেসবুক পেজ ও গ্রুপেও তার শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি পেজের দাবি, সাজবুল এখন গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

শ্রমিকদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা। ছবি: সংগৃহীত
শ্রমিকদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি দাবি করেন, গার্মেন্টসকর্মী পরিচয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে নেমেছেন। মিরপুরে ছাত্রলীগ নেতা সাজবুল ইসলাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, আন্দোলনকে উসকে দিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে এ ধরনের আরও আন্দোলন গড়ে তোলার অপচেষ্টা চলছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার পোস্টে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধেও আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।

আরও পড়ুন

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এলাকাভিত্তিক নেতাদের তালিকা হচ্ছে

এদিকে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিতে কয়েক দিন ধরেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করছিলেন পোশাক শ্রমিকেরা। রোববার সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধের মধ্য দিয়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। পরে মিরপুর-১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ।

সকাল থেকে সড়কে অবস্থান নেওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ চলে দুপুর পর্যন্ত। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ এলাকায় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ বক্স ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় মিরপুর-১০, ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা অবরোধ ও সংঘর্ষে মিরপুরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে সংকটের মধ্যে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন পাসের মাধ্যমে এ নিষেধাজ্ঞা আইনি ভিত্তি পায়। দলটির নিবন্ধনও স্থগিত রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে দলটির প্রধান এবং গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝেই নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

জেবি