Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

মিষ্টির শূন্য আসনে চোখ তাদের, কাকে বেছে নেবে বিএনপি?

বোরহান উদ্দিন

১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৫ এএম

# ক্লিন ইমেজ বেছে নিতে চায় বিএনপি
# মনোনয়ন দৌড়ে ত্যাগের মূল্যায়ন
# আলোচনায় বিএনপির বাইরেও অনেক নাম
# চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান

রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ভাঙচুরের ঘটনার জেরে সাবেক সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে কে পাচ্ছেন বিএনপির মনোনয়ন-এ নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে চলছে নানা আলোচনা। 

একটি আসনের বিপরীতে অভিজ্ঞ নেত্রী, রাজপথের লড়াকু কর্মী, রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি থেকে শুরু করে সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত মুখ-সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছে এক ডজনেরও বেশি নাম। আগামী ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় উপনির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও গ্রহণযোগ্যতার হিসাব-নিকাশও কষছে দলটির নীতিনির্ধারক মহল। তবে শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবে দল, তা নিয়ে এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তা।

দলীয় সূত্র বলছে, সরকার গঠনের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিতর্কের মুখে এক সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনায় সতর্ক বিএনপি। নতুন প্রার্থী বাছাইয়ে তাই গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলের প্রতি ত্যাগকে গুরুত্ব দিতে চায় দলটি। পাশাপাশি বিএনপি ও সাবেক ছাত্রদল নেত্রীদের বাইরেও সমমনা জোটের শরিক দলগুলোর যেসব নারী নেত্রী দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, তাদের কারও কপাল খুলতে পারে এমন আলোচনাও আছে।

যে কারণে শূন্য হলো আসনটি

গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে (মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র) হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। হামলায় ওই এলাকার সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ লোকজনের নাম উঠে আসায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। পরে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে গত ১ অক্টোবর স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। যদিও ভাঙচুরের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা বরাবরই অস্বীকার করেছেন তিনি।

নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলোর আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হয়। বিএনপি বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় এবং এককভাবে সংরক্ষিত আসনটি তাদের ভাগে পাওয়ায় এই একটিমাত্র পদের বিপরীতে আগ্রহীদের ছড়াছড়ি দেখা গেছে।

১২ নভেম্বর উপনির্বাচন, তফসিল ঘোষণা

আলোচিত এই শূন্য আসনে উপনির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল সোমবার (১২ অক্টোবর) ইসির পক্ষ থেকে এই তফসিল ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর এই আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

ইসির ঘোষণা অনুযায়ী, উপনির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা আগামী ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। এরপর ২৭ অক্টোবর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, ১ নভেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ২ নভেম্বর প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের এই তফসিল ঘোষণার পরই সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌঁড়ঝাঁপ অনেকটা বেড়েছে।

আলোচনায় ডজনেরও বেশি নাম!

এই আসনের উপনির্বাচনে কাকে বেছে নেবে বিএনপি তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও নানা মাধ্যমে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ও পরিচিত একাধিক মুখ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় একাধিক নারী নেত্রীর নামও এখন আলোচনায় রয়েছে। 

বিএনপির সহ-মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংরক্ষিত সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়ার নাম শোনা যাচ্ছে বেশি। নিজ জেলা রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান থাকলেও গত নির্বাচনে তার স্বামী হারুনুর রশিদ পরাজিত হওয়ায় বর্তমানে এই দম্পতির কেউ সংসদে নেই।

জানা গেছে, রাজনীতির পাশাপাশি আইন পেশায় নিয়োজিত পাপিয়াকে নিয়ে বেশি আলোচনা আছে। কারণ তার জানাশোনা, সংসদ সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতা অন্যদের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে।

যদিও সাম্প্রতিক সময়ে টকশো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিক ‘বিতর্কিত বক্তব্য’ পাপিয়াকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। দলের হাইকমান্ডের এই বিষয়গুলোও নজরে আছে বলে জানা গেছে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসের নামও শোনা যাচ্ছে। বর্তমানে মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আফরোজা আব্বাসের গ্রহণযোগ্যতাও আছে দলের মধ্যে। তবে তিনি এরআগেই স্পষ্ট করেছেন, সংসদের সংরক্ষিত সদস্য হতে আগ্রহী নন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেত্রী অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম সাগরের নামও শোনা যাচ্ছে। তিনি মিরপুর এলাকার ভোটারও। ২০১৮ সালে নোয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া শাহিনুর বেগম আওয়ামী লীগ আমলে একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন। তার পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যা মামলার আসামিও হয়েছেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

ঢাকা মেইলকে শাহিনুর বেগম সাগর বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছাত্রদলের রাজনীতি শুরু করেছি। কেন্দ্রীয় কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেছি। আন্দোলন, সংগ্রামে কখনো রাজপথ থেকে সরে যাইনি। একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছি। পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগ আমলে মিথ্যা হত্যা মামলার আসামি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সব দিক দিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ২০১৮ সালে বিএনপি আমাকে মনোনয়নও দিয়েছিল। আশা করি দল রাজপথের মতো সংসদেও ভূমিকা রাখার সুযোগ দেবে।

eac98b11-9dc3-4191-9335-76702cd24882

মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রদল নেত্রী অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ গত নির্বাচনে নিজ এলাকা বরগুনা থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও মনোনয়ন পাননি। আওয়ামী লীগের আমলে রাজপথের আন্দোলনে দমনপীড়ন ও একাধিক মামলার আসামি হওয়া আসমা আজিজ দলে পরিচিত মুখ। ফলে উপনির্বাচনে সংরক্ষিত আসন থেকে দল তাকে বেছে নেবে বলে প্রত্যাশা করছেন।

আসমা আজিজ ঢাকা মেইলকে বলেন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের শূন্য পদ পূরণের জন্য দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আবেদন আহ্বান করা হলে আমি অবশ্যই সেখানে আবেদন করব। দলের মনোনয়ন চাইব। আমার নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করতে পারে নাই। আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারব। তবে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

এছাড়াও মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শাহিনুর নার্গিস, বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রদল নেত্রী আফরোজা খানম নাসরিন, দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরার নামও শোনা যাচ্ছে। যিনি কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্বে এসেছেন। এর বাইরেও জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি রুনা লায়লাও আগ্রহী বলে জানা গেছে।

বিএনপির বাইরেও আলোচনায় যারা

বিএনপির বাইরেও একসময়ের জোটসঙ্গী সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের মেয়ে জয়া কাজীর নামও রয়েছে আলোচনায়। এর আগে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চেয়ে আবেদন করে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তিনি। 

এছাড়াও জোটসঙ্গীদের মধ্যেও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল— জেএসডির সহ-সভাপতি ও আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রবের নামও আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে ত্রয়োদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা, দিলরুবা খান, রিজিয়া পারভীন, দিঠি আনোয়ার ও রিনা খানসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের কয়েকজন তারকা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে কেউ মনোনয়ন না পেলেও সংরক্ষিত আসনের উপনির্বাচনে দল এদের বেছে নিতে পারে এমন প্রত্যাশাও করছেন কেউ কেউ।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান

একটি মাত্র আসনের বিপরীতে ডজনেরও বেশি নেত্রীর লবিংয়ের কারণে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া দলীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য বেশ বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, রাজপথের ত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা এবং সংসদে দলের হয়ে কথা বলার যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তফসিল ঘোষণা হওয়ায় শিগগিরই এই আসনে প্রার্থীতা নিয়ে বসবেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। 

এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় এক শীর্ষ নেতা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আকাঙ্ক্ষা থাকা স্বাভাবিক, কারণ সবাই দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নির্দেশনা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।’

বিইউ/এআরএম