Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঠেকাতে নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে: ডা. শফিকুর

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম

বাংলাদেশে নিজস্ব তাহজিব-তামাদ্দুন, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে লালন ও ধারণে ব্যর্থতার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতি আধিপত্য বিস্তার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে ‘কালচারাল অ্যাগ্রেশন’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ বলা হয়। শুধু বক্তব্যের মাধ্যমে এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদ করা সম্ভব নয়; বরং সুস্থ ও নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে দেশীয় সংস্কৃতি সংসদের আয়োজনে ‘নাতে রাসূল (সা.) ও কাওয়ালি সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, প্রত্যেক জাতির নিজস্ব তাহজিব-তামাদ্দুন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু নিজেদের সংস্কৃতিকে লালন ও ধারণে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতি সমাজের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে।

তিনি বলেন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি একটি জাতির মেরুদণ্ড। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর আন্দোলন শুধু সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও ধারণার পরিবর্তনও ছিল এর অন্যতম মূল লক্ষ্য। আল্লাহর মেহেরবানিতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে সেই পরিবর্তন সফলভাবে সাধিত হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গ আদর্শ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও সেই আদর্শ থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

কাওয়ালি ও সংগীতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অনেকে গান শুনলে প্রশ্ন করেন, ‘এ আবার কী?’ কিন্তু বর্তমানে তাফসির মাহফিল কিংবা ওয়াজের মঞ্চেও এমন গান বা সংগীত পরিবেশন করা হয়, যা মানুষের অন্তরকে জাগ্রত করে।

তিনি বলেন, একসময় ফারসি বা উর্দু ভাষায় বিভিন্ন বয়াত শোনা যেত। এখন দেশের মুফাসসির ও ওয়ায়েজরাও বাংলায় এমন গান পরিবেশন করেন, যা মানুষের কলবকে তাজা করে, রুহানি খোরাক জোগায় এবং মানুষকে তার আল্লাহ ও নিজের পরিচয় সম্পর্কে সচেতন করে।

কোরআনের শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, মানুষকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেওয়ার জন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁর শেষ বিধান কোরআন নাজিল করেছেন। কোরআন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়; সমগ্র মানবতা ও আল্লাহর সৃষ্টির জন্য হেদায়েতের বিধান হিসেবে এটি নাজিল হয়েছে।

তিনি বলেন, যারা কোরআনের অনুসরণ করবে, তারা নিজেরাই সৌভাগ্যবান হবে। যে জাতি তা অনুসরণ করবে, সে জাতি গৌরবময় হবে। আর যারা তা থেকে দূরে সরে যাবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও অপদস্থ হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আজ এর বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের আবার মূল শিক্ষার দিকে ফিরে যেতে হবে। এমন শিক্ষা প্রয়োজন, যা আমাদের তামাদ্দুনিক উন্নয়ন ঘটাবে, মনোজগতে পরিবর্তন আনবে, আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করবে এবং সৃষ্টির সঙ্গে সৃষ্টির নির্মল ও পবিত্র ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

এ ধরনের শিক্ষা বাস্তবায়িত হলে সমাজে মানুষ পরস্পরকে সম্মান করবে, ভালোবাসবে এবং একে অপরের অধিকার রক্ষা করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নিজের জীবনের একটি ঘটনা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, কম্পিউটার জগতের ছাত্র হিসেবে কাজ শুরু করার সময় তিনি একজন গাড়িচালকের কাছে সহজে কম্পিউটার শেখার জন্য কাউকে চেনেন কি না জানতে চেয়েছিলেন। ওই চালক তাকে বলেন, ‘স্যার, আমিই তো আপনাকে শেখাতে পারি।’

পরে ওই ব্যক্তির কাছ থেকেই তিনি কম্পিউটারের বেসিক বিষয়গুলো শেখেন। কয়েকদিন পর ওই ব্যক্তি তাকে বলেন, এখন তিনি তাকে ছাড়াই কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তখন তিনি ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন থেকে তো আর তোমাকে নাম ধরে ডাকতে পারি না। তোমাকে কী বলে সম্বোধন করব?’ এরপর তিনি তাকে ‘ওস্তাদ’ বলে সম্বোধন করার কথা জানান।

পরদিন জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে ১৫-২০ হাজার টাকা বেতন পান। কিন্তু তাকে ‘ওস্তাদ’ বলে ডাকার যে সম্মান দেওয়া হয়েছে, সেটির মর্যাদা তার কাছে বেশি।

ওই ব্যক্তি সেই সম্মানের মর্যাদা নিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পরবর্তী সময়ে তার জীবনে অনেক সমৃদ্ধি এসেছে। তিনি তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মান কামনা করেন।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, যার কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে, তাকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতি অনেক সময় আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দিচ্ছে। এমন ঘটনাও দেখা যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষককে অসম্মান করা হচ্ছে, এমনকি শিক্ষকের ওপর হামলাও হচ্ছে। এগুলো সুস্থ সংস্কৃতির চিত্র নয়; বরং অপসংস্কৃতির প্রভাব।

মানুষকে সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সন্তানদের মানুষ হিসেবে তৈরি করতে হলে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশীয় সংস্কৃতি সংসদের মতো সংগঠনগুলোর উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের অভিনন্দন জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বিজয়ীদের বিশেষভাবে শুভেচ্ছা জানান। তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেককে উম্মাহর সত্যিকারের পথপ্রদর্শক হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দান করুন।

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের সামনে আরও ভালো করার চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এ পর্যায়ে আসতে পারেনি, তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে নিজেদের তৈরি করতে হবে। একদিন তারাও এ পর্যায়ে এসে চ্যাম্পিয়ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 এসময় দেশীয় সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগগুলো আরও বিকশিত ও বিস্তৃত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ যেন বাংলাদেশের ওপর রহমত নাজিল করেন, দেশে শান্তির ফয়সালা দেন এবং সব ধরনের বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করেন। নিজেদের ঐতিহ্য, তাহজিব ও পরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার তাওফিক যেন আল্লাহ সবাইকে দান করেন।

এর আগে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান থেকে তিনি সরাসরি এ আয়োজনে এসেছেন জানিয়ে বলেন, সেখানে তিনটি গ্রুপে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিন গ্রুপে দুজন ছাত্রী ও একজন ছাত্র চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন বয়সে বড় এবং একজন তুলনামূলকভাবে ছোট।

তিনি বলেন, ‘আয়োজকদের পক্ষ থেকে বড় দুজনকে ওমরাহর টিকিট দেওয়া হলেও ছোট মেয়েটিকে দেওয়া হয়নি। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। তাহলে সেখানে আবার বৈষম্য থাকবে কেন?’

ছোট মেয়েকেও ওমরাহর সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আল্লাহ যেন তাকে ও তার পরিবারকে এ সুযোগ কবুল করার তাওফিক দান করেন। একই ধরনের কোনো বৈষম্য যেন বর্তমান অনুষ্ঠানেও না হয়, সে জন্য তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

এমএইচ/এএম