Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

লংমার্চে পথে পথে জনস্রোত, ছয় দফা থেকে এক দফার হুঁশিয়ারি

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রথম লংমার্চ ঘিরে পথে পথে ছিল নেতাকর্মী-সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি। রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দান পর্যন্ত কর্মসূচির বিভিন্ন জনসভা ও পথসভা থেকে সরকারকে একের পর এক সতর্কবার্তা দিয়েছেন জোটের নেতারা। 

তাদের ভাষ্য, ঘোষিত ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে তা এক দফায় রূপ নেবে—আর সেই এক দফা হবে সরকারের পদত্যাগ।

শনিবার (সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শাপলা চত্বরের সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শুরু হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে আয়োজিত পথসভায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক অংশ নেন। বিভিন্ন এলাকায় সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে জোটের নেতাদের স্বাগত জানান সমর্থকরা।

এই লংমার্চে প্রধান অতিথি ছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফেনীর মহীপালের পথসভায় তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তোলেন।

6

জামায়াত আমির বলেন, তারা ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। নতুন করে কেউ ফ্যাসিবাদ শুরু করলে ১৫ বছর অপেক্ষা করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা দেশের ধ্বংস সাধন করবেন, সর্বপর্যায়ে আপনারা বেপরোয়া-নির্লজ্জ-বেহায়াপনা করবেন, আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে?’

তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে, যেখানেই জনগণের অধিকার নিয়ে টান দেওয়া হবে, সেখানেই গর্জন করা, সেখানেই বাধা দেওয়া, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আপনারা জনগণের অধিকার নিয়ে টান দিলে বিরোধী দল কঠোরভাবে তা প্রতিরোধ করবে।’

জামায়াত আমির হুঁশিয়ারি দেন, ‘আমরা দলীয় দাবি নিয়ে রাস্তায় নামি নাই। দেশে আবার নতুন করে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। নতুন করে কেউ ফ্যাসিবাদ হওয়ার চেষ্টা করবেন না। এর পরিণাম ভয়াবহ হবে।’

7

তিনি জুলাই গণহত্যা ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, গত ছয় মাসে বড় বড় গণহত্যার বিচার শুরু হয়নি এবং অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া কয়েকটি বিচারও বন্ধ হয়ে গেছে।

গণভোট নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা সবাই দুটি ভোট দিয়েছি। একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের ভোট; অন্যটি বাংলাদেশকে সংস্কার এবং মেরামত করার গণভোট। সরকারি দল এবং আমরা উভয়ে বলেছি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে আমরা তা মেনে নেব এবং তা বাস্তবায়ন করব। সরকার এখন গণভোটের রায় না মেনে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। জনগণের এ দাবি মেনে নেওয়া জনগণের প্রতি কোন অনুগ্রহ নয়, এটি ওয়াদার বাস্তবায়ন।’

মানুষের কষ্টার্জিত টাকা এখন চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের পকেটে যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের আয় বাড়েনি, বরং দায় ও ব্যয় বেড়েছে। মানুষের টাকা কোথায় যায়? চাঁদাবাজ আর দুর্নীতিবাজদের পকেটে যায়। এসব পকেট বন্ধ করতে হবে।’

এর আগে ঢাকার উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও জামায়াত আমিরের মতো একই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘সরকার লংমার্চে বাধা দিলে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে।’ সব বাধা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।

4

ফেনীর পথসভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ‘ছয় দফা দাবি না মানলে বর্তমান সরকারকে জনগণ লাল কার্ড দেখাবে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণের রায়ের সঙ্গে গাদ্দারি করে সংসদে বসে দেশ পরিচালনা করলে জনগণ তা কখনো মেনে নেবে না। আমরা দেশের মানুষের সঙ্গে আছি।’

অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায়কে বাস্তবায়ন করা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

কুমিল্লার পথসভায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘সরকারকে তাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ছয় দফা এক দফায় রূপ নেবে এবং সেই এক দফা হবে সরকারের পদত্যাগ।’

জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ—এই ছয় দাবিতে লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে।

8

জোটের নেতারা চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সংকটের জন্য সরকারের ব্যর্থতাকেও দায়ী করছেন। এসব সংকটের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তারা।

জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে জামায়াত ও সমমনা দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনের অবস্থান কর্মসূচি থেকে জোটের আমির শফিকুর রহমান ঢাকার সঙ্গে রংপুর, খুলনা ও সিলেটের লংমার্চ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে লংমার্চ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা রয়েছে।

5

এদিকে শনিবারের লংমার্চের গাড়িবহর ও বিভিন্ন স্থানে পথসভাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি এলাকায় যানজট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে। জোটের পক্ষ থেকে আগে জানানো হয়েছিল, সাধারণ যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে মহাসড়কের এক পাশ দিয়ে লংমার্চের বহর চলবে।

সব মিলিয়ে প্রথম লংমার্চে পথে পথে নেতাকর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি এবং জোটের নেতাদের ‘ছয় দফা থেকে এক দফা’ যাওয়ার হুঁশিয়ারি রাজপথের আন্দোলনে নতুন বার্তা দিয়েছে। দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে চাপের মুখে ফেলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বড় কর্মসূচির দিকেও এগোচ্ছে বিরোধী এই জোট।

এএইচ/জেবি