বোরহান উদ্দিন
২৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫১ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে প্রথম সংসদ অধিবেশনের দিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন নিয়ে বড় চমক দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্পিকার পদে হেভিওয়েট একাধিক নেতার নাম তুমুল আলোচনায় থাকলেও শেষ মুহূর্তে সাবেক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বেছে নেন। একইভাবে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে। কোনো আগাম পূর্বাভাস বা তথ্য প্রকাশ ছাড়া শেষ মুহূর্তের সেই গোপনীয়তা ও সিদ্ধান্ত তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সবাইকে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও কি বিএনপি প্রধান তেমন কোনো চমক উপহার দেবেন? দল ও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খুবই সংবেদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ এই পদের জন্য বিএনপি চরম ‘ত্যাগী ও বিশ্বস্ত’ কান্ডারি খুঁজছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতার নাম জোরালো আলোচনায় রয়েছে। দলের নেতাদের বাইরে বিচারাঙ্গন ও জনপ্রশাসনের একাধিক নাম আলোচনায় থাকলেও দলের নেতাই বঙ্গভবনের অভিভাবক হবেন—এই সম্ভাবনাই বেশি। তবে স্পিকার নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রপতি পদে কাকে বেছে নেওয়া হবে, শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন তারেক রহমান।
গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সাংবিধানিক নিয়ম মেনে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনার উদ্দেশে আগামী শনিবার (১ আগস্ট) রাতে গুলশানে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছেন বিএনপি প্রধান। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার সার্বিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতেই থাকবে বলে জানা গেছে।
বঙ্গভবনের নতুন অভিভাবক হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গন ও দলীয় আলোচনায় যে কয়টি নাম সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে, তার মধ্যে শীর্ষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রবীণ রাজনীতিক ও বিএনপি মহাসচিব বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
খোদ নেতাকর্মীরা বলছেন, রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে কূটনীতিক মহলে দলের প্রতিনিধিত্ব—সবক্ষেত্রেই তার নেতৃত্ব প্রমাণিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছেও মার্জিত আচরণের জন্য তিনি সমান শ্রদ্ধেয়। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ সুশীল সমাজের একাধিক প্রতিনিধি তাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ‘সেরা পছন্দ’ বলে প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন।
আরও পড়ুন
‘ফেরা’র উল্টো পাশে ‘গ্রিন ভিলা’য় কাটবে সাহাবুদ্দিনের নতুন জীবন
রাষ্ট্রপতি ভোট প্রভাব ফেলবে কি স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনে?
নেতাকর্মীরাও বলছেন, দলের দুঃসময়ে জিয়া পরিবারের প্রতি অবিচল আনুগত্যের কারণে নেতাকর্মীদের কাছে মির্জা ফখরুলের অবস্থান অনন্য উচ্চতায়। তবে তাকে বঙ্গভবনে পাঠাতে হলে সরকার ও দলে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন পড়বে- এমনটাও বলছেন কেউ কেউ। কারণ রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করা হলে তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও মহাসচিব পদ ছাড়ার পাশাপাশি শূন্য করতে হবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে এখনো সময় বেশ বাকি থাকলেও বিএনপি পরীক্ষিত নেতৃত্বকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসাতে চায়। সে ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশাপাশি শীর্ষ নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খানের নাম নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা হচ্ছে। তাদের পাশাপাশি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও প্রবীণ বিএনপি নেতা ড. ওসমান ফারুকের নামও নতুন করে আলোচনায় যুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও কোনো কোনো মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
একই সঙ্গে দলীয় বলয়ের বাইরে সুশীল সমাজ বা বিচার বিভাগ থেকে কোনো সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে এমন আলোচনাও চলছে। সে ক্ষেত্রে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নাম নিয়েও কথা হচ্ছে। প্রশাসনের শীর্ষ পদের একজন কর্মকর্তার নামও রাষ্ট্রপতির পদে বিএনপির পছন্দের তালিকায় আছে এমন প্রচারণাও আছে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় সংকটের সময়ে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকেই এই পদে বাছাই করার সম্ভাবনা বেশি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি পদে কে আসবেন সেই আলোচনার মধ্যে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়ের কথা বলা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, নতুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচন সম্পন্ন করতে বিশেষ কোনো সংসদ অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন পড়বে না। গত ১৫ জুলাই সংসদের অধিবেশন শেষ হয়েছে। সাংবিধানিক নিয়ম মেনে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে সেপ্টেম্বরে বসতে যাওয়া নিয়মিত অধিবেশনে এ নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতোমধ্যে তাদের আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টায় ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনাররা। সংসদ সচিবালয় থেকে সংসদ সদস্যদের নির্ভুল ভোটার তালিকা ইসিতে পাঠানোর পর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়সূচি বা তফসিল ঘোষণা করবে।
সাক্ষাৎ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। তবে নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার ও বিএনপি এ নিয়ে তড়িঘড়ি না করে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আরও পড়ুন
দল গোছাতে তারেক রহমানের মাস্টারপ্ল্যান, স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী
প্রধানমন্ত্রীর ‘গতিতে’ বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট
জানা গেছে, আগামী শনিবার (১ আগস্ট) রাতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই বিএনপির প্রার্থীর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। তবে নীতিনির্ধারকেরা স্পষ্ট করেছেন—আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে দলের দুঃসময়ের সবচেয়ে ত্যাগী, সজ্জন ও আস্থাশীল ব্যক্তিত্বকেই রাষ্ট্রপতি মনোনীত করবে বিএনপি। স্থায়ী কমিটির মতামত শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সর্বময় কর্তৃত্ব থাকবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেই।
বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আলোচনায় অনেক নাম থাকলেও জোরালো আলোচনা মহাসচিবকে নিয়ে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল, সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁর প্রতি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। ওয়েট করতে হবে, চেয়ারম্যান কী সিদ্ধান্ত নেন, তার আগে কিছু বলার সুযোগ নেই।’
এই নেতা আরও বলেন, ‘দলের বাইরে থেকে কাউকে এই পদে নিয়োগের আপাতত কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ভবিষ্যতেও হবে কি না তা সময় বলবে।’
বিইউ/জেবি