Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

কওমি ধারার দলগুলো কি জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম

দেশে কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দলের একজোট হওয়ার চেষ্টার খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ উদ্যোগটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে এখনকার বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা এ ধরনের দলগুলোর জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

জামায়াত জোটে থাকা কওমি ধারার দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তারা বলছেন, এখনই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা নতুন জোট করার চিন্তা তারা করছেন না।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলছেন, বিএনপি ও সরকার তাদের 'জোট নিয়ে ষড়যন্ত্র' করছেন বলে মনে করেন তারা। তবে এতে ১১ দলীয় জোটের কোনো ক্ষতি হবে বলে তারা মনে করছেন না।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী জামায়াত-জোট নিয়ে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক কৌশলে বিএনপি যদি অন্য রাজনৈতিক দলকে কাছে টানতে পারে তাতে দোষের কিছু নেই।

গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে 'ওয়ান বক্স পলিসি' অর্থাৎ ইসলামি দলগুলোর এক বাক্সে ভোট–এই স্লোগান নিয়ে জামায়াতে ও ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি ইসলামি দল আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করে জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। পরে গত বছরের শেষে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যোগ দিলে এটি ১১-দলীয় জোটে রূপ নেয়।

নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনেও নেমেছিল ওই মোর্চা। পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তারা আন্দোলন থেকে সরে এসে নির্বাচনি তৎপরতা শুরু করে।

আরও পড়ুন

ইসলামপন্থীদের ভোট ‘একবাক্সে’ আনার চেষ্টা থমকে গেল!

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলছেন, কওমি ধারার দলগুলোর নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য এত ব্যাপক যে, তারা শেষ পর্যন্ত কতটা একমত হতে পারে সেই প্রশ্ন আছে। ‘তারা এক হয়ে মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে চাইতে পারে। কিন্তু বহু ভাগে বিভক্ত দলগুলোর মধ্যে চিন্তার পার্থক্য অত্যন্ত তীব্র। সেজন্য তাদের ঐক্য প্রক্রিয়া কতদূর এগুতে পারে সেই কৌতূহল থাকবে। আবার এটি কারও ইন্ধনে হচ্ছে কি-না সেটি পরিষ্কার হতেও সময় লাগবে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

কওমি ধারার জোট নিয়ে কী হচ্ছে

কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন ও কওমি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকটির নেতাদের সাথে আলাপ করে যে ধারণা পাওয়া গেছে সেটি হলো, নির্বাচনের পর থেকেই এ ধরনের দলগুলোর সঙ্গে সরকারি দল বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ সম্পর্ক বাড়ানোর অনানুষ্ঠানিক কিছু উদ্যোগ নেয়। অন্যদিকে নির্বাচনের ফল নিয়েও কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, কারণ তারা মনে করে আলাদা তিন ভাগ হয়ে নির্বাচনে যাওয়ায় ধর্মভিত্তিক এসব দল নির্বাচনে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

এর আগে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার লক্ষ্য নিয়ে একটি জোট গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই এবং জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকেই এ উদ্যোগটি তখন নেওয়া হয়েছিল।

Hefajot
কওমি ধারার সাতটি দলকে জামায়াত জোট থেকে বের করতে চায় হেফাজত। ছবি: সংগৃহীত

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বরিশালের চরমোনাইয়ে গিয়ে চরমোনাই পীর হিসেবে পরিচিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সাথে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের 'সৌজন্য সাক্ষাতে'র ঘটনা তখন ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল। মূলত এর ধারাবাহিকতাতেই নির্বাচনে আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করেছিল জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ইসলামি দল। কিন্তু পরে নির্বাচন এগিয়ে আসার সাথে সাথে বিএনপির দিক থেকে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাসখানেক আগে চলতি বছরের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন '১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য' থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত তারা আলাদাভাবেই নির্বাচনে অংশ নেয়।

কওমি ধারার দলগুলোও এই নির্বাচনে মূলত তিন ভাগ হয়ে অংশ নিয়েছে। এতে জামায়াতে ইসলামীর জোটে থেকে যায় খেলাফত মজলিসের দুই অংশ ও নেজামে ইসলাম। আর বিএনপির সাথে গিয়ে চারটি আসনে বিএনপির সমর্থন পায় জমিয়ত উলামায়ে বাংলাদেশ।

সংসদে এখন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুজন এবং খেলাফত মজলিসের একজন সদস্য আছেন। দুটি দলই জামায়াতের জোটে আছে। এই জোটে থাকা অন্য দল নেজামে ইসলামের কাউকে নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি।

কওমি দলগুলোর নেতারা বলছেন, নির্বাচনের পরে বিএনপির দিক থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। আবার বড় কওমি মাদরাসাগুলো জামায়াতের সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে কিছু কওমি ধারার দল। এমন প্রেক্ষাপটে কওমি ধারার দলগুলোকে এক ধারায় আনার জন্য হেফাজতে ইসলামের আমির একটি উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার কওমি ঘরানার সাতটি দলকে নিয়ে সভা করেন হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।

আরও পড়ুন

সংসদে চার ইসলামি দলের ২৪ জন আলেম, বদলাচ্ছে সমীকরণ

এতে বিএনপি জোটে থাকা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জামায়াত জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছিলেন।

মূলত এরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয় যে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা দলগুলো জোট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলছেন, দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। ‘হেফাজতে ইসলামের আমির নির্বাচনের আগেই কওমি ধারার দলগুলোকে এক করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে একেক দল একেক দিকে গেছে। এখন সবাই নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে যে সাত দল আগামীতে এক সাথে বসবো,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

Jamat
গত নির্বাচনের আগে জামায়াতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১১ দলীয় ঐক্য। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুখপাত্র ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলছেন, তারা জামায়াত জোটে আছেন এবং সেই জোট ছাড়ার কোনো চিন্তা এখনো তারা করেননি। ‘আমাদের বৈঠকটা ছিল পরস্পর যাতে আরও কাছে আসা যায়, নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব যেন কমানো যায়। নীতিগতভাবে একসাথে চলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সাত দলকেই প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে। হয়তো ইস্যুভিত্তিক ঐক্যও হতে পারে। ১১ দলীয় জোটে থাকা কিংবা না থাকা আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমরা মনে করি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সব দলের নিজের মতোই নেওয়া উচিত,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন

সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার দায় জামায়াতকে দিলেন চরমোনাই পীর

তবে জামায়াতে ইসলামীর অনেকের ধারণা, তাদের জোট থেকে কওমি ধারার দলগুলোকে বের করে নেওয়ার একটি চেষ্টা হচ্ছে এবং তারা মনে করেন এই চেষ্টার পেছনে সরকারের হাত আছে।

‘আমাদের মনে হয় এটা বিএনপি ও সরকারের ষড়যন্ত্র। তবে আমাদের জোটে যারা আছেন তারা কেউ আমাদের জোট ছাড়ার কথা বলেননি। আমার মনে হয় তারা জোটেই থাকবেন। জোটের ভেতরে কোনো সমস্যা বা দূরত্ব হলে সেটি আমরা আলোচনা করেই নিরসন করবো। কওমি ধারার দলগুলোর উদ্যোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বা জোটের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

তবে কওমি ধারার দলগুলোকে জামায়াত জোট থেকে বের করার জন্য সরকার বা বিএনপি ষড়যন্ত্র করছে- এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ‘আমরা কেন ষড়যন্ত্র চক্রান্ত করতে যাবো। রাজনীতিতে কৌশল ও নীতি বলতে একটা বিষয় আছে। বিএনপি যদি তার নীতি ও কৌশল দিয়ে অন্য দলকে কাছে টানতে পারে তাহলে সমস্যা কোথায়। কোনো দল তাতে একমত হলে অসুবিধা কোথায়। এখানে গোপন তো কিছু নেই,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তবে বিএনপি জামায়াত জোটে থাকা কওমি ধারার দলগুলোকে নিজের দিকে আনার চেষ্টা করছে কি-না তার কোনো সরাসরি জবাব দেননি রিজভী। সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি