ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সব ভোট এক জায়গায় আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াত ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি দলে সমঝোতা হওয়ার আলোচনা ছিল নির্বাচনের আগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ ব্যাখ্যা করলেন ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। জামায়াতের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তার কারণেই নির্বাচনের আগে যে সমঝোতা হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।
সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মুহাম্মাদ রেজাউল করীম সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি একথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে চরমোনাই পীর বলেন, নির্বাচনি জোট নয়, আমরা শুরুতেই পরিষ্কার করেছি- এটা হবে নির্বাচনি সমঝোতা। আমরা সবাই মিলে আলাপ-আলোচনাও চালিয়েছি। অনেকেই আশা করেছিল বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির বাইরে এবার ইসলামি দলগুলো নির্বাচনে ভালো কিছু করবে। কিন্তু সমঝোতার ক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা না করে এককভাবে জামায়াত নতুন নতুন দলকে যুক্ত করা ও তাদের আসন বণ্টনের বিষয়ে সমঝোতার আগে থেকেই থাকা দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ না করে একক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া ভারত-আমেরিকার সঙ্গে গোপন বৈঠক করা, ইসলাম অনুয়ায়ী দেশ পরিচালনা না করে বিদ্যমান আইনে দেশ পরিচালনা করার অঙ্গীকার করা, মার্কিনিদের সঙ্গে বৈঠকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ‘উগ্রবাদী’ বলে ‘সার্টিফাই’ করা হয়। এককভাবে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা, ক্ষমতালিপ্সু চিন্তার কারণে সমঝোতা আর হয়নি। এরপরও নানা প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু সমঝোতা রক্ষা করা যায়নি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তবর্তীকালীন সরকারের চুক্তির বিরোধিতা করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে আমেরিকার সঙ্গে যে একটা বাণিজ্য চুক্তি করেছে, এই চুক্তিটা আমরা পর্যালোচনা করেছি। এটা আমাদের দেশের জন্য কল্যাণকর নয়, এটা আমাদের দেশের জন্য এক কথায় গোলামির চুক্তি। আমরা বলব, সংসদে বর্তমান সরকার যারা রয়েছে, বিরোধী যারা রয়েছে, গুরুত্ব সহকারে এটা আলোচনা করে দেশের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবেন। যেকোনো চুক্তি করার আগে আমাদের দেশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী। তাই আমরা এই চুক্তির বিরোধিতা করছি।
নির্বাচনের সময় বিএনপির সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল- সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চরমোনাই পীর বলেন, রাজনীতিতে বিভিন্ন দলই বিভিন্ন সময় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, আলোচনা করে। কেউ জোটের প্রস্তাব দেয়, কেউ সমঝোতার কথা বলে। জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন সময় নিজেদের অবস্থান থেকে আমাদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। তারা মনে করে, একসঙ্গে চললে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা, এমপি-মন্ত্রিত্ব কিংবা ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার রাজনীতি নয়। আমরা রাজনীতি করি দেশের কল্যাণ, মানুষের কল্যাণ এবং ইসলামের কল্যাণের লক্ষ্যে। শুধু কয়েকটি সংসদীয় আসন পাওয়া, দুই-একটি মন্ত্রিত্ব লাভ করা কিংবা সম্মান-সম্পদের মালিক হওয়া আমাদের উদ্দেশ্য হতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
চরমোনাই পীর বলেন, আমাদের কাছে মূল বিষয় হলো দেশ, মানুষ ও ইসলামের স্বার্থ। যেখানে ইসলামের কল্যাণ থাকবে না, মানুষের উপকার থাকবে না, দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে না। সেখানে যত বড় প্রস্তাবই আসুক, আমরা অতীতেও যাইনি, বর্তমানেও যাব না, ভবিষ্যতেও যাওয়ার প্রশ্ন আসে না। ভবিষ্যতে কারও সঙ্গে ঐক্য বা একসঙ্গে পথচলার প্রশ্ন এলে, সেটাও হবে নীতির ভিত্তিতে। যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশ, ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে কাজ করবে; যারা ক্ষমতা বা সম্পদের লোভে নয়, মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াবে তাদের সঙ্গে ভবিষ্যতে ঐক্যের পথ অবশ্যই খোলা রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান বিজেপি সরকারের প্রতিনিধিরা যে আচরণ করছে, তা কোনো মানবিক আচরণ হতে পারে না। এটি মানবতারও পরিপন্থী। তারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তাদের কর্মকাণ্ড সেই কথার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমরা তো ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যায় জেনেছি যার যার ধর্ম, সে স্বাধীনভাবে পালন করবে। কিন্তু সেখানে পশু কোরবানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ এসব কোনোভাবেই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় বহন করে না।
তিনি বলেন, আমরা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর এ ধরনের আচরণ বন্ধ করতে হবে। আমরা এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা জানাই। আমাদের দেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে, কিন্তু আমরা তাদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আচরণ করি। দেশ ও সমাজ গঠনের কাজে আমরা সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলার চেষ্টা করি। এটাই হওয়া উচিত একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়।
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আমাদের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, ইনশাআল্লাহ। তবে আমরা কোনো ১১ দলীয় জোট বা অন্য কোনো জোটের ব্যানারে নয়, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেব।
চরমোনাই পীর বলেন, এছাড়া আমরা লক্ষ্য করছি, বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই আপনি বারবার বলেছেন সবাইকে নিয়ে দেশ গঠন করবেন। কিন্তু বাস্তবে যদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে দলীয় বিবেচনায় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে তা দেশের জন্য শুভ হবে না। আমরা আহ্বান জানাই, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে, আলোচনার মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নিয়োগ ব্যবস্থা করা হোক।
চরমোনাই পীর আরও বলেন, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গেও আমরা বলতে চাই, নির্বাচন ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা নিয়ে শুধু আমরা নই, সংসদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও প্রশ্ন তুলেছে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্তত স্থানীয় নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়, সে বিষয়ে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজন করা অত্যন্ত জরুরি। তাই সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে খুব শিগগিরই স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক।
বিইউ/জেবি




